আর যে ভাইটি একান্তই অবুঝ, না বুঝে এ সব বাক্য উচ্চারণ করছে, আমাদের সবার দায়িত্ব তাকে বুঝিয়ে ফিরিয়ে আনার। হজরত গঙ্গুহী রহঃ এর বাক্য, যা আমার হৃদয়ে সদা ভীতির সঞ্চার করে,
" যারা ওলামাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতো, তাদের কবর খুলে দেখো, তাদের চেহারা কিবলা থেকে ফিরিয়ে উল্টোমুখী করে দেয়া হয়েছে।"
১… খতীব সাহেব মসজিদে ঢুকলেন। দক্ষিণ-পূর্ব কর্নারে
চাদর দিয়ে ঢাকা বেডিংয়ের স্তুপ। নিশ্চয় জামাত এসেছে।
হাসিমুখে এগিয়ে গেলেন খতীব সাহেব। আমীর সাহেবকে তালাশ করে বের
করলেন। খুতবার আগের বয়ানটা অবলীলায় আমীর সাহেবের কাছে সোপর্দ করলেন। আর দু'জানু বসে বড়ই আদবের সাথে বয়ান শুনতে থাকলেন। আজ খতীব সাহেবের মিম্বরে
বসে বয়ান করছেন সওদাগর সাহেব।
চেয়ারম্যান সাহেব পাঁচ বছরের সাধনার পর এবার নির্বাচিত হয়েছেন।
একটা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারটাতে এখন একমাত্র তারই অধিকার। এই
চেয়ারটি কখনও কারও সম্মানে তিনি ছাড়েন না। ছাড়তে পারেন না। এ তার অনেক কষ্টের
অর্জন।
খতীব সাহেব বারো-চৌদ্দ বৎসরের মেহনতের পর অর্জন করেছেন এ
যোগ্যতা। আজ এই মিম্বরে বসার অধিকার তার। মসজিদের সভাপতির জন্যও ছাড়েন না।
সেক্রেটারির জন্যও না। কেবল অবলীলায় ছেড়ে দেন তাবলীগওয়ালাদের জন্য। যদিও বয়ানকারী
বয়ানে শত ভুল করে, তেলাওয়াতকৃত আয়াতের তাজবীদে গন্ডগোল
লাগিয়ে দেয়। কিন্তু খতীব সাহেব মা শা আল্লাহ বলে সবাইকে জামাতের আমলে শরীক হওয়ার
দাওয়াত দিয়ে দেন। এভাবেই ওলামায়ে কেরামের আন্তরিক সহযোগিতায় তাবলীগ জামাতের
মর্যাদা মানুষের অন্তরে বাড়তে থাকে।
মাওলানা শাহ জমির উদ্দীন নানুপুরী। রহমাতুল্লাহি আলাইহি।
মাদ্রাসায় জামাত এলে দাঁড়িয়ে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বলতে থাকেন, মাদ্রাসার ছাত্ররা! ইনারা আল্লাহর রাস্তার মেহমান। দ্বীনের জন্য
কুরবানি করছেন। ওনাদের মাথায় তেল লাগিয়ে দাও। ওনাদের কাপড় ধুয়ে দাও। আমার
মাদ্রাসায় তিনকাজ তালীম-আমাল-দাওয়াত।
আমাদের এক সাললাগানো আলিমের ভাষায়, নানুপুর
মাদ্রাসায় জামাত এলে এমন কদর যেন শাশুড়বাড়িতে এসেছে।
হজরত আল্লামা হারুন ইসলামাবাদী। রহমাতুল্লাহি আলাইহি। তাবলীগের
সাথীরা কি যে ভুল-ভাল বয়ান করে -এ অভিযোগের জবাবে বললেন, ছোট
বাচ্চা যখন কথা শেখে, কত ভুলই না করে। কিন্তু সে ভুলে ভরা
উচ্চারণ বাপ-মায়ের কতই না ভালো লাগে। এই সাধারণ মানুষগুলো দ্বীন শেখার চেষ্টা
করছে। তাদের এই ভুলে ভরা বয়ান না জানি আল্লাহ তায়ালার কত পছন্দ!
এভাবেই! ওলামায়ে কেরামের আন্তরিক ভালবাসায়, পরিপূর্ণ সহযোগিতায় এই মেহনত এই পর্যায়ে উঠে এসেছে।
ছয়নম্বর নিয়ে কত প্রশ্ন! এরা ইসলামের মুল ভিত্তি পাল্টে দিয়েছে।
জবাব দিয়ে পরিস্থিতি ঠান্ডা করেন ওলামায়ে কেরাম। চিল্লা নিয়ে কত কথা! মসজিদে থাকা
নিয়ে কত প্রশ্ন! সব অভিযোগের জবাব ওলামারা দিয়ে যান।
এভাবেই ওলামা হজরতগন বরাবরই তাবলীগ জামাতের পাশে।
আমরা যোগ্য ছিলাম না। তাঁরা তাঁদের সেই মিম্বর আমাদের মতো
অযোগ্যদের জন্য ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের সেই সহযোগিতা না থাকলে মসজিদের রগচটা
মুসল্লিরা কবেই আমাদের টেনে হিঁচড়ে মিম্বর থেকে নামিয়ে ফেলতো।
আশ্চর্য! সময়ের ব্যবধানে তাঁরাই আজ আমাদের নজরে তাবলীগবিরোধী!
আমরা চিৎকার দিয়ে চলেছি 'আমাদের মিম্বর দখল করতে চায়!
আমাদের মারকাজ দখল করতে চায়!'
খুসূসী গাশত মানেই দ্বীনের বড়দের তালাশ। তাঁদের প্রথমে লাগবে।
তাঁদের সমর্থন লাগবে। তাঁরা মসজিদ কমিটির রক্তচক্ষুকে ফাঁকি দিয়ে জামাতের সাথে
বসেন। মশকের সময় সুরা ফাতেহা ঠিক করে দেন। চুপিচুপি টয়লেটের চাবিটা আমীর সাহেবের
হাতে গুঁজে দেন। সেই তারাই আজ আমাদের বড় প্রতিপক্ষ। আজ আমাদের কারও কারও মুখ দিয়ে
অহরহ এ কথাই বের হচ্ছে ' আলিমরা দ্বীনের জন্য কি করেছে।'
যিনি বলছেন, তিনি তাঁর ব্যস্ততম চেম্বার
বন্ধ করে বছরে একবার চিল্লা দেন। লক্ষটাকার ইনকামের কুরবানি হয়। দ্বীনের জন্য এ যে
মহা কুরবানি! যারা দুনিয়াকে তিন তালাক দিয়ে দ্বীনি ইলমের চর্চা ও দ্বীনের হেফাজত
করার জন্যে সারাজীবন দিয়েছে, তা তো একটা চিল্লার সামনে
সামান্যই !
হে মাওলা! আমরা অন্ধ। প্রকৃত কল্যাণকামীদের চেনার তৌফীক আমাদেরকে
দাও।
২… হজরতজী ইলিয়াস রহঃ প্রথমেই বুঝেছিলেন, যদি ওলামায়ে কেরাম আমার এই মেহনত নিয়ে আপত্তি করেন, তাহলে এই কাজ চলবে না। তাই এই
মেহনতের রূপরেখা তিনি সর্বপ্রথম ওলামায়ে
কেরামের কাছে পেশ করেছিলেন।
হজরত মুফতি কেফায়াতুল্লাহ রহঃ ছিলেন দেওবন্দের প্রধান মুফতি।
তাকে বলা হতো মুফতিয়ে আজম হিন্দ। তিনিই ছিলেন হজরতজী ইলিয়াস রহঃ এর প্রথম সহযোগী।
কুরআন-সুন্নাহর সাথে মিলিয়ে তিনিই সর্বপ্রথম মেহনতের রূপরেখার প্রতি ইতমিনান
প্রকাশ করেছিলেন।
উপমহাদেশের দ্বিতীয় ব্যক্তি হজরতজী যার সমর্থন মেহনতের জন্য
অত্যাবশ্যক মনে করেছিলেন, তিনি হচ্ছেন হজরত মাওলানা আশরাফ
আলী থানবী রহঃ। থানবী রহঃ এর সমর্থন আদায়ের জন্য এক জামাতকে তিনি বিশেষ হেদায়াত
দিয়ে থানাভবন এলাকায় রোখ করেছিলেন। হজরত সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী রহঃ ' হজরত ইলিয়াস রহঃ ও তাঁর দ্বীনি দাওয়াত' কিতাবে
সবিস্তারে এ ঘটনা লিপিবদ্ধ করেছেন। থানবী রহঃ জামাতের কারগুজারী শুনে জামাতকে কিছু
হাদিয়া দিয়েছিলেন। জামাতের জিম্মাদার সেই হাদিয়া হজরতজীর কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন।
হজরতজী সেই হাদিয়া দেখে এত খুশী হয়েছিলেন, তার জবান দিয়ে
এই কথা বের হয়েছিলো, ' এই মেহনতের সাথে যখন হজরত থানবীর
হাতের বরকত যোগ হয়েছে, ইন শা আল্লাহ এই মেহনত চলবে।
সেই প্রথম সারির ওলামায়ে কেরাম, যাদের
দোয়া, সমর্থন এই মেহনতের ভিতকে মজবুত করে দিয়েছিলো।
আরবদের কাছে এই মেহনতকে পরিচিত করার উদ্দেশ্যে সর্বপ্রথম যাকে
নির্বাচন করা হয়েছিলো, তিনি সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী
রহঃ। নিঃসন্দেহে সে সময় মেহনতকে আরবদের কাছে পেশ করার জন্যে তিনিই যোগ্যতম ব্যক্তি
ছিলেন।
মেহনতের সাথে ওলামায়ে কেরামের সমর্থন এভাবে পাশাপাশি এগিয়ে
চলেছে।
'তাবলীগে তো ভালো আলিম নেই ' - অভিযোগের
জবাবে দেওবন্দের তৎকালিন প্রধান মুফতি মুফতি মাহমুদ হাসান গঙ্গুহী রহঃ এ জবাব
দিয়েছিলেন, আমি তাবলীগেরই মুফতি। তাবলীগই আমাকে মুফতি
বানিয়েছে।
তাবলীগের দ্বারা ইসলাহে নফস কতটুকু হবে এ সংশয়ের জবাবে দেওবন্দের
তৎকালিন মুহতামিম হজরত ক্বারী তৈয়ব সাহেব রহঃ এই জবাব দিয়েছিলেন, ' নিশ্চয় দাওয়াত ও তাবলীগের কাজের মধ্যে ইসলাহে নফস আছে। '
তাবলীগের কাজের সমালোচনার জবাবে ওলামায়ে কেরাম বার বার কলম
ধরেছেন। তাঁদের কিতাবাদি এর পক্ষে সাক্ষী হয়ে আছে। শায়খুল হাদীস রহঃ এর ' তাবলীগ জামাতের সমালোচনা এবং এর জবাব' এই
বিষয়ে প্রথম বই।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর হজরত আল্লামা শাহ আহমদ শফী দামাত
বারাকাতুহুম একদম তরুন বয়সে দাওয়াতের মেহনতের পক্ষে কলম ধরেছেন। তাঁর রচিত 'দাওয়াত ও তাবলীগ-একটা জিহাদ ' এ বিষয়ে একটা
মাইলফলক। আফসোসের সাথে বলতে হয়, চট্টগ্রামের কিছু অবুঝ
সাথী 'হেফাজতে ইসলাম লাভলেইন মারকায দখল করতে আসছে '
জানিয়ে থানায় জিডি করে এবং মারকাযে পুলিশ মোতায়েন করে, যা তাবলীগের জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। অথচ সেদিন পুলিশ মারকাযে এক
অভাবনীয় দৃশ্য প্রত্যক্ষ করে অবাক হয়। হাজার হাজার তালেবে ইলম ও শীর্ষ স্হানীয়
ওলামায়ে কেরামের সেদিন বেডিং কাঁধে শান্তিপূর্ণ উপস্থিতি পুলিশকেও এ-কথা বলতে
বাধ্য করে, ' এর নাম মারকায দখল করতে আসা?'
হজরত মুফতিয়ে আজম রহঃ 'তাবলীগ করা কি
ফরজ? '- এর এমন এক হিকমতপূর্ণ জবাব দিয়েছেন, যা তাবলীগের সাথীদের মুখে মুখে এখনও শোনা যায়। তিনি বলেছেন, তাববলীগ হলো উম্মুল ফারায়েজ -সব ফরজের মা। একজন বিজ্ঞ আলিমের একটা
উক্তিই দাওয়াতের মেহনতকে হাজারগুন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট প্রমানিত হয়েছে।
পটিয়ার মুফতি সাহেব রহঃ এর এই উক্তিটিও মেহনতের কার্যকারিতা
বুঝানোর জন্যে প্রবাদবাক্য তুল্য -' তাবলীগ হলো
চলতি-ফিরতি মাদ্রাসা।'
মুফতিয়ে আজম রহঃ একদিনের জন্যও তাবলীগে যাওয়ার সুযোগ করতে পারেন
নি, কিন্তু
তাঁর লিখনী, তাঁর বক্তব্য চট্টগ্রামের
মতো বৈরী এলাকায় দাওয়াতের মেহনতের গ্রহনযোগ্যতা তৈরিতে বিশাল ভূমিকা রেখেছে।
বাংলাদেশে দাওয়াতের মেহনতের রূপকার হচ্ছেন হজরত আল্লামা শামসুল
হক ফরিদপুরী রহঃ। তিনিই সর্বপ্রথম বাংলাদেশে তাবলীগের কাজ শুরু করার জন্য হজরত
মাওলানা আব্দুল আজিজ খুলনাবী রহঃকে, যিনি বড় হুজুর রহঃ
নামে প্রসিদ্ধ, দাওয়াতের কাজ শিখে আসার জন্য নিজামুদ্দিন
পাঠান এবং মানুষের কাছে দাওয়াতের কাজের গ্রহনযোগ্যতা বাড়ানোর জন্য স্বয়ং নিজে
নিজের শত দ্বীনি ব্যস্ততার মাঝেও প্রতি বছর চিল্লা দিতেন।
যে সাথী এ ইতিহাস মনে রাখবে, সে কখনও
ওলামার বিরুদ্ধে, মাদ্রাসার বিরুদ্ধে জবান খুলবে না।
মাদ্রাসা ও ওলামাদের বিরুদ্ধে যে সব প্রোপাগান্ডা বামপন্থি ও নাস্তিকেরা চালিয়ে
আসছে, সে কথাগুলি কিভাবে একজন তাবলীগওয়ালার মুখ দিয়ে
উচ্চারিত হতে পারে? ' তারা হেফাজত, তারা পাকিস্তানপন্থী, তারা জঙ্গি' - এ সব বাক্য পাগড়ি পরিহিত একজন তাবলীগওয়ালার মুখে কিছুতেই মানায় না,
মানাতে পারে না।
বরং আলিম-ওলামাই এই মেহনতের প্রাণ। ওলামাদের অান্তরিক রাহবারিই
এই মেহনতের আসল চালিকাশক্তি।
মারকাযের বাইরের ওলামাদেরও আক্রমন করবো, আবার মারকাযের সাথে সংশ্লিষ্ট ওলামাদেরও চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করবো- এ
কিছুতেই একজন প্রকৃত তাবলীগওয়ালার কাজ হতে পারে না। আমরা যদি তাবলীগি পরিচয়ে
পরিচিত কারও মুখ থেকে এ ধরনের কথা শুনি, তাহহলে আমাদের
মনে করতে হবে এ বর্ণচোরা, ইসলামেরই কোন দুশমন বদ মতলবে
তাবলীগের বেশ ধরেছে। ইলিয়াসী ফিকরে যে ফিকরবান, তার মুখ
দিয়ে কখনোই এমন বাক্য বের হতে পারে না। সময় এসেছে প্রকৃত তাবলীগওয়ালা চেনার।
আর যে ভাইটি একান্তই অবুঝ, না বুঝে এ সব
বাক্য উচ্চারণ করছে, আমাদের সবার দায়িত্ব তাকে বুঝিয়ে
ফিরিয়ে আনার। হজরত গঙ্গুহী রহঃ এর বাক্য, যা আমার হৃদয়ে
সদা ভীতির সঞ্চার করে,
" যারা ওলামাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতো, তাদের কবর খুলে দেখো, তাদের চেহারা কিবলা থেকে
ফিরিয়ে উল্টোমুখী করে দেয়া হয়েছে।"
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন।