আলমি শূরার
সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে
হযরতের আজীবনের মামুল
****************************
৩. ফাযায়েলে
আমলের মুকাবেলায় মুনতাখাব হাদিস
****************************
জামাতে তাবলীগ যেসব উসূলের ওপর প্রতিষ্ঠিত, সেগুলোর মাঝে রয়েছে, কালিমায়ে তাইয়্যেবা,
নামায, ইলম ও যিকির, ইকরামুল মুসলিমিন, ইখলাসে নিয়্যত ও তাফরিগে
ওয়াক্ত।’
মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ রহ. তাঁর ইনতিকালের কয়েক বছর পূর্বে এই
ছয় উসূলের ওপর পৃথক পৃথক আকারে হাদিস সংকলনের কাজ গুরুত্বের সঙ্গে শুরু করেন। তিনি
একসঙ্গে কয়েকজন আলেমকে আলাদা আলাদাভাবে বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে দেন যে, তারা যেন প্রচুর তত্ত্ব-তালাশ করে এ সব বিষয়ের হাদিস একত্র করে। তিনি
সেই বিষয়গুলোর অধীনে অনেকগুলো শাখা শিরোনামও নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন।
সেই দায়িত্বপ্রাপ্ত আলেমদের একজন হলেন, মাওলানা
আবদুল্লাহ তারেক। যিনি বসতি নিযামুদ্দিনে মুকিম ছিলেন। তাঁকে ইকরামুল মুসলিমিন
শিরোনামের অধীনে হাদিস সংকলন করার দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছিল। মেহনতের যে সকল সাথী
এই কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত, তারা ভালো করেই জানেন যে,
হযরত মাওলানা রহ. এই কিতাব সংকলন করার উদ্যোগ ও পরিকল্পনা এ
উদ্দেশ্যে নিয়েছিলেন যে, যেন এই কিতাবের অনেকগুলো কলমি
পান্ডুলিপি তৈরি করে বিভিন্ন মারকাযে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেই মারকায গুলোর মুকিম
উলামা হযরত এই পান্ডুলিপি থেকে ইসতিফাদা করতে পারেন (উপকৃত হতে পারেন)। যার কারণে
এ গ্রন্থটি যেমন হায়াতুস সাহাবা, আমানিয়ুল আহবার প্রভৃতির
মত দ্বিতীয় হযরতজি রহ.-এর ২২ বছরের ইমারতের যুগে প্রকাশিত হয়নি, তদ্রুপ তৃতীয় হযরতজি রহ. এর ৩২ বছরের সুদীর্ঘ ইমারতের যুগেও আলোর মুখ
দেখেনি।
কিন্তু একটি বিশেষ মানসিকতা ও পরিকল্পনা গ্রহণ করে ১৪২১ হি.
মুতাবেক ২০০০ সালে উর্দূ, আরবি-সহ বিশ্বের ডজন খানেক
ভাষায় ও অনেকগুলো দেশে প্রচন্ড দ্রুততার সঙ্গে কিতাবটি প্রকাশ করা হয়। এ জাতীয়
পদক্ষেপের ফলে ওই সব গোষ্ঠী ও শ্রেণি- যারা কোনোদিন শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মদ
যাকারিয়া রহ. এর মুহাদ্দিসি মর্যাদা ও ফাযায়েলে আমল গ্রন্থের দিগন্ত বিস্তৃত
সুখ্যাতি৬ হজম করতে পারেনি, যেই গোষ্ঠী ও শ্রেণি চিরকাল
দেওবন্দ ও দেওবন্দের মর্যাদাকে বিষমাখা দৃষ্টিতে দেখতো, তাদের
ঘরে ঘরে উল্লাসের মচ্ছ্বব শুরু হয়ে যায়।
এখন যেসব সাধারণ সাথী জামাতে বেরোচ্ছে, তাদের
কাছ থেকে; বড় বড় ইজতিমায় উপস্থিত সাধারণ জনগণের কাছ থেকে
বড় গলায় এ অঙ্গীকার নেওয়া হচ্ছে যে, তারা যেন অবশ্যই
তাদের তালীমের মাঝে এই মুনতাখাব হাদিস পড়ে এবং দেশে থাকুক, কিবা বিদেশের সফরে বের হোক- সর্বাবস্থায় যেন এ কিতাবটি নিজের সঙ্গে
রাখে।
এতো ঢাক-ঢোল আর হম্বিতম্বি পেটানোর পরও এখন পর্যন্ত এ কিতাবটি
এতোটা মজলুম হয়ে আছে যে, এখন পর্যন্ত কিতাবটির তালীমের
সময় নির্ধারণের ব্যাপারে মানসিক টানাপোড়েন ও চৈন্তিক বিভাজনের কারণে কোনো
নির্দিষ্ট তরতিব চূড়ান্ত হয়নি। প্রথমদিকে এলানে বলা হতো, প্রথমে
ফাযায়েলে আমল পড়ে শেষে কিছু সময়ের জন্যে এ কিতাব থেকেও তালীম হবে। এরপর দ্বিতীয়
রুখ আসে, একদিন ফাযায়েলে আমল থেকে তালীম হবে, পরদিন মুনতাখাবের তালীম হবে। এখন তৃতীয় রুখ জারি হয়েছে, সকালে মুনতাখাবের তালীম হবে, সন্ধ্যায়
ফাযায়েলের তালীম হবে। আল্লাহ মালুম,আগামীতে চতুর্থ রুখ কী
আসবে?
এখানে একটি কথা স্মরণ রাখা দরকার যে, সকালে
মুনতাখাব থেকে ও সন্ধ্যায় ফাযায়েলের তালীম, এই তরতিব জারি
করার আসল উদ্দেশ্য হলো, যেসব জামাত আল্লাহর রাস্তায় বের
হয় বা ইজতিমাগুলোতে তালীমের আসল ও দীর্ঘ সময় হলো, সকাল।
মেহনতের সাথীগণ সকালের তালীমে অংশগ্রহণের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এর
বিপরীতে সন্ধ্যার সময়টি সর্বদিক বিবেচনায় গুরুত্বহীন ও সংক্ষিপ্ত।
মুনতাখাব আহাদিস কিতাবের সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এ কিতাবটি যদিও একদিকে বেশ দামী ও মূল্যবান; কিন্তু
অন্যদিকে এ কিতাবটি ক্রমশ ঝগড়া ও সংঘর্ষের কারণ হতে চলেছে। এই কিতাবের কারণে
মেহনতের সাথীদের মাঝে চরম বিভাজন ও ফেতনা বেড়েই চলেছে।
এর প্রথম কারণ হলো, যারা খোলা চোখে
মেহনতের সঙ্গে জড়িত, তাদের কাছে এ কিতাব রচনার প্রেক্ষাপট
স্পষ্ট। তারা বেশ ভালোভাবেই জানেন যে, এ কিতাবটি রচনা করা
হয়েছে স্রেফ শায়খুল হাদিস হযরত মাওলানা মুহাম্মদ যাকারিয়া মুহাজিরে মদনি রহ. এর
ইলমি মর্যাদা ও মুহাদ্দিসানা শানকে চ্যালেঞ্জ করার জন্যে। যেন এর মাধ্যমে মেহনতকে
দু’টি পৃথক শিবিরে ভাগ করা যায় এবং মেহনতের সাথীদের মাঝে
বিশৃঙ্খলা তৈরি করা যায়।
এখানে আমি আমার দিনলিপির ডায়রি থেকে শা’বান
১৪২৭ হি./ সেপ্টেম্বর ২০০৬ ঈ. তারিখে অনুষ্ঠিত জোড়ের এক টুকরো তথ্য তুলে ধরছি। যা
পড়ে পাঠকবর্গ খুব সহজেই বুঝতে পারবেন যে, যে সকল সাথী
হযরত মাওলানা ইনআমুল হাসান রহ. বা তাঁরও আগে হযরত মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ রহ. এর
আমল থেকে এই দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের সঙ্গে জড়িত, সেই
ক্বুদামা বা পুরনো সাথীগণ এই মেহনতের নাজুক ও সূক্ষ বিষয়গুলো সম্পর্কে সম্যক অবহিত
হওয়ার কারণেই তারা এই কিতাব অর্থাৎ মুনতাখাব আহাদিসকে দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের
মাঝে অন্তর্ভুক্ত করা এবং এটিকে ফাযায়েলে আমলের পরিবর্তে নিয়ে আসার উদ্যোগের
বিরুদ্ধে কতটা জোরালো ভাবে, কতটা তীব্রতার সঙ্গে বিরোধিতা
জানিয়ে আসছেন। আমি সেদিনের দিনলিপিতে লিখেছিলাম,
“১৮ শাবান ১৪২৭ হি./ ১২ সেপ্টেম্বর ২০০৬।
এদিন বিকেল চারটায় সাহারানপুর থেকে রওয়ানা হয়ে নিরাপদে রাত ৯টায়
মারকাযে পৌঁছি। আজকাল এখানে হিন্দুস্তানের পুরনো সাথীদের জোড় চলছে। জানতে পারলাম,
সাহেবযাদা হায়াতুস সাহাবার তালীমের পূর্বে জোরালো ভাষায় উপস্থিত
সূধীমন্ডলীকে মুনতাখাব আহাদিসের আনুষ্ঠানিক তালীমের উৎসাহ দিচ্ছে। যার ফলে বাইরে
থেকে আগত পুরনো সাথীদের মাঝে চরম বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে। সিদ্ধান্ত হয়েছে, সবাই মিলে তাকে জানাবে যে, যতক্ষণ পর্যন্ত
মাশওয়ারার মাঝে সিদ্ধান্ত না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি এর উৎসাহ দেবেন না। সেমতে এ
নিয়ে কথা বলার জন্যে ভাই ফারুক সাহেব, ডক্টর সানাউল্লাহ,
ভাই খালেদ সিদ্দিকি, মাওলানা ইবরাহিম
দেওলা, মাওলানা আহমদ লাট সাহেব প্রমুখ একত্র হয়ে ঈশার
নামাযের পর মাওলানা যুবায়রুল হাসান সাহেবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বিষয়টি নিয়ে
তাঁদের গভীর উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তার কথা তুলে ধরেন। পরদিন ৯ শাবান বুধবার মাশওয়ারার
পর এ সকল হযরত মাওলানা যুবায়রুল হাসান রহ. এর উপস্থিতিতে সাহেবযাদা সাহেবের সঙ্গে
আলোচনা করেন এবং সবাই এই কিতাব জারির বিরুদ্ধে নিজ নিজ অভিমত ব্যক্ত করেন।
সাহেবযাদা প্রথম দিকে প্রচন্ড খুব্ধ হন। শক্ত ও রুক্ষ শব্দ
ব্যবহার করেন। কিন্তু সবার সম্মিলিত অভিমতের সামনে শেষ পর্যন্ত চুপ হয়ে যান। তখন
সিদ্ধান্ত হয়, সামনের রায়ভেন্ড ইজতিমায় বিষয়টি নিয়ে
সম্মিলিতভাবে চিন্তা করা হবে।
মুনাজাতের পর দুপুর একটায় আমি দিল্লি থেকে রওয়ানা হয়ে মাগরিবের
আগে আগে সাহারানপুর পৌঁছে যাই। একই ধারাবাহিকতায় ১৪২৭ হিজরি/২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত
হজের সফরেও দাওয়াত ও তাবলীগের পুরনো সাথীদের সঙ্গে সাহেবযাদা মাওলানা সাদ সাহেবের
মুনতাখাব আহাদিস নিসাবভুক্ত করা-না করা নিয়ে প্রচুর কথা কাটাকাটি হয়। ওই সময়
একাধিকবার পরিস্থিতি বেশ উত্তপ্তও হয়েছিল। সাহেবযাদার প্রবল ইচ্ছা ছিল, তাৎক্ষণিকভাবে কিতাবটিকে নিসাবের মাঝে অন্তর্ভুক্ত করবে এবং সর্বত্র
পড়া হবে। এর বিপরীতে অন্যসব হযরত এককভাবে ফাযায়েলে আমলের ওপরই জোর দিয়ে যাচ্ছিলেন।
-------------------------
৬. এখানে আমি একজন জার্মান প্রাচ্যবিদের একটি গবেষণার উদ্ধৃতি
দেওয়ার প্রয়োজন মনে করছি, যিনি এ দাবি করেছেন যে, বর্তমান সময়ে পুরো দুনিয়াতে দেওবন্দ ও দেওবন্দি মতাদর্শের উত্থান ও
বিস্তৃতি এককভাবে ফাযায়েলে আমলের কল্যাণে হয়েছে। কাজেই পাঠকবর্গই এখন সিদ্ধান্ত
নিন, কোন গোষ্ঠী ও কোন বলয়ের সন্তুষ্টি হাসিল করার
স্বার্থে ফাযায়েলে আমলের স্থানে মুনতাখাব আহাদিসকে চয়ন করা হলো!?
--------------------------
মাওলানা যুবায়রুল হাসান কান্ধলভি রহ. / অব্যক্ত বেদনার বিস্মৃত
ইতিহাস- পৃষ্ঠা নম্বর ২৪-২৬
0 কমেন্টসগুলো:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন