আলমি শূরার
সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েহযরতের আজীবনের
মামুল
***********************************আলমি শূরা সম্পর্কে
এই বিশদ আলোচনার অধীনে একটি তথ্য পাঠকবর্গের সামনে উপস্থাপন করা জরুরি মনে করছি।তাহলো, মাওলানা যুবায়রুল হাসান রহ. সেই
আলমি শূরার প্রতি শুধু মৌখিক সম্মানই দেখাননি; বরং তিনি সর্বোতভাবেসেই শূরার প্রতিটি
সিদ্ধান্তের ওপর আমলও করতেন।নিম্নে আমরা কয়েকটি উদাহরণ পেশ করছি-
১. শূরার সিদ্ধান্তের
প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাইআত স্থগিত করা
-----------------------------------------------------------
শূরা সর্ব প্রথম এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে,
এখন থেকে নিযামুদ্দিন মারকাযে বাইআতের সিলসিলা বন্ধ থাকবে। কাজেই
যেসকল সাথী যেই মাশায়েখ বা আকাবিরের কাছে বাইআত হতে চান, তারা
তাঁদের নিজ নিজ অবস্থানস্থলে গিয়ে এই সিলসিলা জারি রাখতে পারেন।
মাওলানা যুবায়রুল
হাসান রহ.-কে আল্লাহ তাআলা রহমতের প্লাবনে সিক্ত করুন। তিনি তৃতীয় হযরতজি রহ. এর ইনতিকালের
পর আলমি শূরার এই সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বাইআত করার ক্ষেত্রে পূর্ণ সতর্কতা
অবলম্বন করতেন। অথচ ওই যুগের অসংখ্য আকাবির বাইআত হতে ইচ্ছুক তালিবদেরকে আত্মশুদ্ধির
জন্যে হযরতের শরণাপনড়ব হওয়ার ও হযরতের সঙ্গে রূহানি সম্পর্ক গড়ে তোলার নসিহত করতেন।
কিন্তু হযরত রহ. এই মামুল বানিয়ে নিয়েছিলেন যে, যখন কেউ তাঁর হাতে বাইআত হওয়ার জন্যে জোরাজুরি করত তখন
তিনি এ কথা বলতেন যে, ‘আব্বাজান রহ. এর বাইআতই যথেষ্ট। আপনি
এখন তাঁর বাতলানো মামুলাতের ওপর আমল করুন। হ্যাঁ, কোনো কিছু
জানার প্রয়োজন বোধ করলে আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন।
আমি নিজে তাঁর
মজলিসে অজস্রবার এ দৃশ্য
দেখেছি যে, দাওয়াতের অনেক সাথী ও উলামায়ে
কেরাম তাঁর হাতে বাইআত হওয়ার জন্যে উপর্যুপরি অনুরোধ করতো; কিন্তু তিনি এ কথা বলে অসম্মতি জানিয়ে দিতেন যে, ‘শূরার পক্ষ থেকে নিষেধ রয়েছে। যেই শূরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার মাঝে আমি নিজেও আছি। কাজেই আমি নিজেই আবার বাইআত করিয়ে কীভাবে সেই ফয়সালা
অমান্য করি’! অনেক ভাই সরাসরি বা চিঠির মাধ্যমে আমাকে দিয়ে
তাঁর কাছে সুপারিশ করিয়েছেন; কিন্তু হযরত রহ. জীবনের শেষ নিঃশ্বাস
পর্যন্ত এ সিদ্ধান্তের ওপর অবিচল ছিলেন। এক্ষেত্রে আমি সর্ব প্রথম সুপারিশ করেছিলাম মাওলানা মুহাম্মদ সুলায়মান ঝাঞ্ঝি ভাইয়ের জন্যে। তিনি
আমাকে বারবার জোরাজুরি করে তার জন্যে সুপারিশ করার অনুরোধ করেন; কিন্তু হযরত রহ. শূরার সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান জানিয়ে পরিষ্কার অমত জানিয়ে
দেন। সুরাটের সম্ভ্রান্ত পরিবার মুনিয়ার বংশের দু’জন বিখ্যাত
ব্যক্তিত্ব জনাব আলহাজ শেখ মাহমুদ মুনিয়ার ও জনাব শেখ আবদুল হাফিয মুনিয়ার সম্পর্কে
আমি ব্যক্তিগতভাবে জানতে পেরেছি যে, এ দু’জনও হযরত রহ. এর কাছে বাইআত হওয়ার জন্যে প্রবল অনুনয়-বিনয় করেছিলেন;
বরাবরের মত এদেরকেও হযরত শূরার সিদ্ধান্তের ওজর পেশ করে অসম্মতি জানিয়েছিলেন।
হযরতের বাইআতের অস্বীকৃতির কথা প্রফেসর খালেদ সিদ্দিকি সাহেব তাঁর পত্রে লিখেছেন-
আমার মনে পড়ে, একবার আমি নির্জনে মরহুম মৌলভি যুবায়র
সাহেবের কাছে আবেদন করেছিলাম, ‘আপনার হাত বাড়িয়ে দিয়ে আমাকে
বাইআত করে নিন। আমি পূর্বে মাওলানা ইউসুফ সাহেব রহ. এর কাছে বাইআতাবদ্ধ ছিল। তাঁর ইনতিকালের
পর মাওলানা মুহাম্মদ ইনআমুল হাসান রহ. এর কাছে বাইআত হয়েছি। এখন তাঁর ইজাযতপ্রাপ্ত
খলিফাদের মধ্যে শ্রেফ আপনি একাই আছেন। কাজেই আপনি আমাকে বাইআত
করে নিন, যেন আমি শূন্য না থাকি।’
কিন্তু আমার
সেই অনুরোধে মৌলভি যুবায়র রহ. সায় দেননি। অথচ ওই মুহূর্তে সেই হুজরায় শুধু আমরা দু’জনই ছিলাম। আমার অনুরোধের উত্তরে
তিনি বলেন, ‘হযরতের ইনতিকালের পর শূরা মাশওয়ারা করে কোনো কল্যাণ
সামনে রেখে বাইআত স্থগিত রেখেছে। আমি সেই শূরার একজন সদস্য। ওই মাশওয়ারায় আমি শরিক
ছিলাম। শূরার সেই সিদ্ধান্তের কারণে বাইআত স্থগিত করে দিয়েছি। শূরার সেই সিদ্ধান্তের
বিরোধিতা করা ঠিক হবে না। তুমি হযরতের কাছে বাইআত হয়েছিলে। হযরত পড়ার জন্যে যেই অযিফা
দিয়েছেন, তা আদায় করতে থাকো। অবশ্য এক্ষেত্রে কোনো রাহবারি
চাইলে আমি হাজির আছি। কিন্তু শূরার মাশওয়ারার বিরোধিতা করে বাইআত নেওয়া আমার জন্যে
সমীচীন হবে না।’
আমি যদ্দূর
জানি, তিনি আজীবন
কাউকে বাইআত করেননি। খুব দ্রুত পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়ে চলে
গেছেন। আল্লাহ তাআলা তাঁর কবরের ওপর রহমত বর্ষণ করুন।
২. শূরার সিদ্ধান্তের
প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের আরেকটি নজির
----------------------------------------------------------
শূরার আরেকটি বড়
ধরনের সিদ্ধান্ত ছিল, ‘এখন থেকে এই আলমি মেহনতে কোনো আমির থাকবে না। সব জায়গায় এই মেহনত জামাতি
শূরার বুনিয়াদের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।‘ মাওলানা যুবায়রুল
হাসান রহ.কে আল্লাহ তাআলা রহমতের প্লাবনে সিক্ত করুন। তাঁর হাশর-নশর তাঁর মহান পিতৃপুরুষদের
সঙ্গে করুন। তিনি শূরার এই সিদ্ধান্তকে পূর্ণ হাসিমুখে, আন্তরিক
সৌহার্দ্যরে সঙ্গে গ্রহণ করে নিয়েছিলেন। নিজের জীবনের শেষ বিশ বছরের মুবারক মুদ্দতে
তিনি সবসময় নিজেকে জামাতি ফয়সালা ও সর্বসম্মিলিত মাশওয়ার অনুগত বানিয়ে রেখেছিলেন। তিনি
যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা থেকে নিজেকে সর্বোতভাবে নিষ্কলুষ রেখেছেন। যার ফলে এই দাওয়াতি
মেহনত গোটা দুনিয়াতে নিজের পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থেকেছে এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে
কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা দেখা দেয়নি। এটি নিঃসন্দেহে তাঁর
ওপর মহান আল্লাহর অপরিসীম দয়া ও করুণা যে, তিনি তাঁর শ্রদ্ধেয়
আব্বাজান তৃতীয় হযরতজি মাওলানা ইনআমুল হাসান রহ. এর ইনতিকালের পর আরো বিশ বছর জীবিত
ছিলেন। এই দীর্ঘ মুদ্দতে মেহনত আলমি শূরার অধীনে পরিচালিত হয়েছে। ইতিহাসের এই প্রলম্বিত
সময়ে একটিবারের জন্যেও তিনি আমির হওয়ার খায়েশ কারো কাছে ব্যক্ত করেননি। বা কোনো ধরনের
হিলা-বাহানা-কৌশল অবলম্বন করে নিজের আমিরত্বের দাবি তোলেননি।
এক্ষেত্রে তিনি
তাঁর মহান দু’অগ্রপথিক
মনীষা দ্বিতীয় হযরতজি রহ. ও তৃতীয় হযরতজি রহ. এর পদাঙ্ক অনুসরণ করে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন।
কারণ, হযরত মাওলানা ইয়াকুব সাহেবের ভাষায়, ‘এ দু’ হযরতজি যদিও সবার সম্মিলিত সিদ্ধান্তে আমির
ছিলেন; কিন্তু কখনই তারা নিজেদেরকে আমির দাবি করেননি। কখনই
কোনো কথা আমিরসুলভ ঢঙে বলেননি। কখনই নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেননি। আমির হওয়া সত্তে¡ও তাঁরা সবসময় নিজেদেরকে মাশওয়ারার অনুগত
বানিয়ে রাখতেন। [২৩ যিলক্বদ ১৪৩৭ হি./১৩ আগস্ট ২০১৬ তারিখে লেখা চিঠি]
বইয়ের কলেবর সংক্ষিপ্ত
রাখার উদ্দেশ্যে শুধু দুটি উদাহরণ পেশ করলাম,
যেখানে শূরার সিদ্ধান্তের প্রতি হযরত রহ. এর পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রকাশ
পেয়েছে। নয়তো এ ধরনের উদাহরণের তালিকা খুবই দীর্ঘ।
********************************************************
মাওলানা
যুবায়রুল হাসান কান্ধলভি রহ. / অব্যক্ত বেদনার বিস্মৃত ইতিহাস- পৃষ্ঠা নম্বর ২২-২৪
0 কমেন্টসগুলো:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন