১.
হিংসা ও বিদ্বেষের দুঃখজনক প্রকাশ
==============================
তৃতীয় হযরতজি মাওলানা
মুহাম্মদ ইনআমুল হাসান কান্ধলভি রহ. এর ইনতিকালের মাত্র দু’
দিন পর সর্বপ্রথম যে জোড় হরিয়ানা, পাঞ্জাব ও হিমাচল প্রদেশের সাথী
ভাইদের নিয়ে নিযামুদ্দিন মারকায দিল্লিতে ১২, ১৩, ১৪ মুহাররম, মুতাবেক ১২, ১৩, ১৪ জুন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেই জোড়ের দু’দিন পর ১৭, ১৮, ১৯
মুহাররম, মুতাবেক ১৭, ১৮,
১৯ জুন তারিখে হিন্দুস্তানের পুরনো সাথী এবং দাওয়াত ও তাবলীগের সকল
যিম্মাদার সাথী নিযামুদ্দিন মারকাযে সমবেত হন। এমনকি ২৮ মুহাররম, মুতাবেক ২৮ জুনের মিরাঠ ইজতিমাও সার্বিক অস্থিরতা ও অরাজকতার ভেতর দিয়ে
কোনোমতে সম্পন্ন হয়।
প্রচন্ড গরম ও উত্তপ্ত লু হাওয়া তখন থেকেই বইতে শুরু
করেছিল। সময়ের সাথে সাথে গরমের উত্তাপ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। আমি যেহেতু ওই সময়কার
ঘটনাবলি খুব কাছ থেকেই প্রত্যক্ষ করছিলাম,
এজন্যে খুব ভেবে-চিনতে ধীরে-সুস্থে পা
ফেলে অগ্রসর হচ্ছিলাম। সতর্ক পদক্ষেপ হিসেবে মিরাঠের সেই ইজতিমায় একজন সাধারণ মানুষ
হিসেবে সাহারানপুর থেকে অংশগ্রহণ করি এবং খুবই সাদামাঠাভাবে নীরবে সাহারানপুরেই ফিরেই
আসি। কিন্তু যখন সফর মাসের দু’ তারিখে, মুতাবেক ২ জুলাই মেওয়াতের সফর হয়, সেই সফরে বিগত বছরগুলোর ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে এই অধমও মাওলানা যুবায়রুল
হাসান রহ. এর সঙ্গে নিযামুদ্দিন থেকে রওয়ানা হই। সেদিন অন্য একটি গাড়িতে মাওলানা উমর
পালনপুরি রহ. মেওয়াতের উদ্দেশে রওয়ানা হন। পালনপুরি রহ. হচ্ছেন সেই মহান ব্যক্তিত্ব,
যাকে তৃতীয় হযরতজি রহ. আরবদের কাছে لسان الدوه واتبليغ (দাওয়াত ও তাবলীগের
মুখপত্র) শব্দে পরিচয় করিয়ে দিতেন। খোদ শায়খুল হাদিস রহ. কয়েক সপ্তাহ ইসতিখারা ও দুআ
করার পর যাঁকে মারকাযের জন্যে নির্বাচন করেছিলেন। আমাদের বহনকারী গাড়িটি মাত্র নিযামুদ্দিন
থানার গেইটে পৌঁছেছে, ওই সময় সাহেবযাদা মাওলানা সাদ সাহেব প্রচন্ড ক্রোধে ফেটে পড়েন। তিনি সবার সামনে গাড়ি থেকে নেমে
তার সমুদয় ক্রোধ আমার ওপর ঝারতে শুরু করেন। আমি উদ্ভূত পরিস্থিতি ও সাহেবযাদার
দেমাগি হালত দেখে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিই যে, এখন আমাকে পূর্ণ মৌনতা অবলম্বন করে গাড়ি থেকে নেমে যেতে
হবে। সেমতে আমি আমার সামানপত্র নিয়ে গাড়ি থেকে নিচে নেমে যাই। আল্লাহ তাআলার সবিশেষ
তাওফিকে আমি পূর্ণ ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দিয়ে সেই সফর তাৎক্ষণিক মুলতবি করে সামান-পত্র
নামিয়ে আনি। ওদিকে মাওলানা যুবায়রুল হাসান সাহেবের পক্ষে যেহেতু নিজের ইজ্জত বাঁচানোই
মুশকিল হয়ে পড়েছিল। কারণ তিনি পূর্ব থেকেই পরিস্থিতির শিকার হয়ে নিরুপায় জীবন যাপন
করছিলেন। এজন্যে তিনিও সেই পরিস্থিতিতে পূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করেন। প্রচন্ড কষ্টে তিনিও তখন সফর মুলতবি করার সিদ্ধান্ত
নেন; কিন্তু আমার একান্ত
অনুরোধে তিনি মেওয়াত রওয়ানা হন। আমার সঙ্গে যাচ্ছেতাই আচরণ করার পর সাহেবযাদা তার সমুদয়
ক্রোধ উগড়ে ফেলেন মাওলানা উমর পালনপুরি রহ. এর ওপর। এভাবে
তার উত্তপ্ত ক্রোধ বর্ষণের একমাত্র কারণ হলো, কেন তার জন্যে মিরাঠের সাথীরা (হাফেয
মুহাম্মদ হারুন,হাফেয সিরাজ, ভাই
আমিরুদ্দিন ও হাজি রঈসুদ্দিন সাহেবগণ) বিশেষভাবে নিজেদের গাড়ি নিয়ে এসেছেন?
তখন হাফেয মুহাম্মদ হারুন সাহেব ঘটনাস্থলেই উত্তর দিয়েছিলেন,
‘আমরা হযরতজি রহ.-এর যুগ থেকে বছরের পর বছর ধরে নিজেদের গাড়ি নিয়ে
আসছি। মেওয়াত ও এর আশপাশের এলাকাগুলোতে হযরতজি রহ. ও মাওলানা উমর পালনপুরি রহ. আমাদের
গাড়িতে চড়েই সফর করে থাকেন; কিন্তু সাহেবযাদা সাল্লামাহু তার
সেই উত্তর কানেই তুললেন না।২ এমন চিৎকার-তান্ডবের পর মাওলানা মুহাম্মদ
উমর পালনপুরি রহ.ও কোনো ধরনের শব্দ না করে গাড়ি থেকে নেমে আসেন। প্রচন্ড শারীরিক দুর্বলতা ও রোগ-ব্যাধির প্রকোপে দুর্বল শরীর
সত্ত্বেও দু’জন খাদেমের
কাঁধের ওপর হাত রেখে ওই সড়কের ওপর তিনি দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন। তাঁর সঙ্গীগণ ট্যাক্সিস্ট্যান্ড
গিয়ে দ্বিতীয় গাড়ি নিয়ে আসা পর্যন্ত তিনি এভাবেই সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকেন। এরপর মাওলানা
রহ.ও পূর্ণ নীরবতা অবলম্বন করে, শব্দহীন ধৈর্য ও নীরবতার পরিচয়
দিয়ে উপস্থিত সাধারণ মানুষের সামনেই অন্য একটি গাড়িতে চড়ে মেওয়াতের উদ্দেশে রওয়ানা
হন।মাওলানা যুবায়রুল হাসান রহ. এর দিবস-রাত এভাবেই প্রচন্ড বেদনা ও বিষন্নতায় নীল হয়ে উঠেছিল। ওই সময়কার কথা
ও অব্যক্ত অনুভূতির দহন তিনি হযরত মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলি নদভি রহ.কে লেখা
তাঁর একটি চিঠিতে তিনি খানিকটা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি ওই চিঠিতে লিখেছিলেন―
‘হযরত আব্বাজান
রহ. এর ইনতিকালের পর থেকে আমার ওপর প্রতিটি মুহূর্তে চিন্তা ও পেরেশানি চেপে আছে। আগামী
১৯ মার্চ থেকে কলম্বো, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড- এ দেশগুলোতে প্রায় একমাসের দীর্ঘ সফর
করতে হবে। প্রচন্ড অক্ষমতা ও বিপর্যয় নিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত
দুআ ও মনোযোগের মুখাপেক্ষী। আশা করি, আপনি আপনার দুআয় অধমকে
স্মরণ রাখবেন। ২২ রমাযান থেকে সহোদরাও সাহারানপুর থেকে এসেছেন। হযরত আব্বাজান রহ. এর
ইনতিকালের কারণে তাঁর মনেও গভীর দাগ পড়েছে। তিনিও মাসনুন সালাম ও দুআর অনুরোধ জানিয়েছেন।৩ এ ধরনের
কান্ড-কারখানা ওই যুগে
প্রচুর ঘটেছে। এভাবে কেটে যায় একটি বছর।
১৪১৭ হি./১৯৯৬
ঈ. এর সর্বশেষ সূর্য ডুবে যায়।
শুরু হয় নতুন বছর।
নতুন বছরের মাত্র এক মাসের মাথায়৪ সফর ১৪১৭ হি./ ২১ জুন ১৯৯৬ ঈ. তারিখে ঘটে
যায় এমন কিছু কান্ড, যা অতীতের সমস্ত কান্ড-কারখানাকে হার মানায়। সেদিনের
পর থেকে প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত মারকাযের চৌহদ্দির ভেতরে এমন কিছু ঘটনা ঘটতে থাকে,
যা দাওয়াত ও তাবলীগের ভবিষ্যত ও খোদ মারকাযের কপালে এঁকে দেয় বিশাল
প্রশ্ন বোধক চিহ্ন। ওই সময়ের দিবা-রাত্রির
ঘটনাগুলো অধম নিজের দিনলিপিতে লিখে রেখেছিলাম। এখন সময় হয়েছে, সেই ঘটনাগুলো পূর্ণ সতকর্তার সঙ্গে,
খানিকটা সংক্ষেপে জনতার আদালতে মেলে ধরব। যদিও সেসব ঘটনা ও পরিস্থিতির
অনেকগুলো চরিত্র বর্তমান বিশ্ববাসীর সামনে অজানা; কিন্তু মহান
আল্লাহর কাছে অজানা ও অজ্ঞাত নয়। বেশ কিছু নাজুক কারণ সামনে থাকায় আমরা আমাদের এ বইয়ে
তাদের নামগুলো পাঠকদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মহান আল্লাহ তাদের
সবার ও আমাদের যাবতীয় গুনাহের ওপর পর্দা ঢেলে দিন। আমিন।
আসুন, দিনলিপির পাতাগুলোর ওপর সংক্ষেপে
চোখ বুলিয়ে নিই-
৪ সফর ১৪১৭
হি./জুন ১৯৯৬ ঈ.। মেওয়াত
থেকে একের পর এক সংবাদ আসছে যে, মৌলভি... ও মৌলভি.... এখানে বিশৃঙ্খলা ছড়াচ্ছে। তারা স্থানীয় লোকদেরকে মারকাযে
এসে নিজেদের দাবি জোরালো ভাষায় উপস্থাপন করার উৎসাহ দিচ্ছে। তাদের অনেকগুলো দাবির মধ্য
হতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো, সকাল এগারোটায় যেই দুআ হয়,
তা যেন দু’সাহেবই পরিচালনা করেন। একদিন এই
সাহেব। পরদিন ওই সাহেব।৪
দু-তিন আগে এই
প্রসঙ্গে .... অঞ্চলের স্থানীয় পঞ্চায়েতে আলোচনা উঠেছিল। সেখানেও উগ্রতার প্রকাশ ঘটেছে।
মরহুম মাওলানা যুবায়র সাহেবের পক্ষ থেকে এই তথ্য সেখান থেকে আগত লোকদের মাধ্যমে
.... এর কাছে পাঠানো হয় যে, তিনি যেন এই ফেতনা থামিয়ে দেন। কিন্তু তিনি তা না করে চুপ থাকাকেই কল্যাণকর
মনে করছেন।
৪ সফর, মুতাবেক ২১। জুনের জুমার নামাযে সেখানকার লোকদের আগমন
শুরু হয়ে যায়। সেদিন দিবাগত রাতে বসতির একটি মসজিদে প্রচুর পরিমাণ লোক জড়ো হয়। আসর
নামাযের পর সেখানে দু’জন আলেম .... বেশ আন্তরিকতার সঙ্গে নসিহত করেন। ওই নসিহতে তারা উপস্থিত
লোকদেরকে বিভিন্ন ভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেন; কিন্তু তাদের
উত্তেজনা কিছুতেই শীতল হচ্ছিল না। ওই সময় আগত লোকদের মধ্য হতে কিছু লোক যখন ফিরে যাওয়ার
উদ্যোগ নেন তখন মৌলভি .... তাদেরকে এ কথা বলে থামিয়ে দেন যে, আগামীকাল বারোটার দুআর আগে কেউ যেন স্থান ত্যাগ না করে। শুক্রবার মাগরিব নামাযের পর স্থানীয় পুলিশ তৎপরতা শুরু করে দেয়। তারা বসতি নিযামুদ্দিনের
কয়েকজন মুরুব্বির মাধ্যমে মাওলানা .... এর কাছে সংবাদ পাঠান যে, আমাদের কাছে বিভিন্ন স্থান থেকে এ তথ্য এসেছে যে, বেশ কিছু দুস্কৃতিকারী এখানে জড়ো হয়েছে। আর এই মৌলভি.... ও মৌলভি.... কারা?
আমরা তাদের সঙ্গে নিয়ে অনুসন্ধান করতে চাচ্ছি। যার পরিপ্রেক্ষিতে
মৌলভি .... হাফেয .... এর মাধ্যমে মাওলানা যুবায়রুল হাসান রহ. এর কাছে সংবাদ পাঠান
যে, ‘এই আগত লোকদের কী বলব? তাদের
সঙ্গে কীভাবে কথা বললে সঙ্গত হবে?’ তখন এর উত্তরে মাওলানা
যুবায়র সাহেব বলেন, ‘আজ থেকে তিন-চার মাস পূর্বেও ঠিক আজকের
মতো করে মৌলভি .... মানুষ জড়ো করে হাজির করেছিলেন। তখন আমি আপনার কাছে আমার চিন্তা
ও উদ্বেগের বিষয়টি প্রকাশ করেছিলাম; কিন্তু আপনি কিছুই বলেননি।
এখন আমি আপনাকে কী বলবো! আপনি যেমন ইচ্ছে, যেভাবে ইচ্ছে কথা
বলুন।’পরদিন শনিবার ৫ ই সফর আগত লোকদের বেশ বড় একটি অংশ মাশওয়ারায়
ঢুকে পড়ে। মাওলানা যুবায়র রহ. সেদিন ফেতনার ভয়ে মাশওয়ারায় অনুপস্থিত থাকেন। মাশওয়ারায়
অনাকাঙ্খিতভাবে অনুপ্রবেশকারী লোকেরা এ দাবি তোলে যে, জামাতের
বিদায়ের ধরন ও দুআর ইনতিযাম পরিবর্তন করা হোক। সেই মাশওয়ারায় মিয়াঁজি মেহরাব সাহেব
উপস্থিত ছিলেন। তিনি তিনবার এ কথা স্পষ্ট করেন যে, আলমি শূরার
মাশওয়ারায় এ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে যে, সকালের দুআ মাওলানা
যুবায়র সাহেবই পরিচালনা করবেন। প্রফেসর নাদের আলি সাহেবও এ প্রসঙ্গে কিছু কথা বলতে
চেয়েছিলেন; কিন্তু মাওলানা .... তাকে থামিয়ে দেন। ওই দিন বিশৃঙ্খলা
ও অরাজকতার কারণে মাওলানা যুবায়রুল হাসান সাহেব জামাতের রুখসতি ও দুআর দায়িত্ব পালন
করতে পারেননি। এ দু’কাজ মিয়াঁজি মেহরাব সাহেব সম্পন্ন করেন।
সেই শনিবার সকালে সাহেবযাদা সাহেব মাওলানা যুবায়রুল হাসান সাহেবের কাছে একটি পত্র নিয়ে
হাজির হন। তাকে দেখে যুবায়র সাহেবের ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙ্গে পড়ে। তাঁর দু’চোখ বেয়ে দরদর করে এমন ভাবে অশ্রু ঝরতে থাকে যে, একপর্যায়ে তিনি হেঁচকি তুলে কাঁদতে শুরু করেন। দু’ঘণ্টা পর্যন্ত এমনভাবে কাঁদছিলেন যে, তাঁর পুরো
চেহারা লাল হয়ে যায়। মাওলানা মুহাম্মদ আকেল সাহেবের ছেলে মৌলভি মুহাম্মদ জাফর সাহেব
তখন আমাদের ওই মজলিসে উপস্থিত ছিলেন। তিনি আমাকে উঁচু কণ্ঠে বলেন, ‘ভাই যুবায়রকে আপনি চুপ করান।’
সাহেবযাদার উপস্থিতিতে
আমি তৎক্ষণাৎ এ উত্তর দিই যে,
‘মৌলভি জাফর,
তুমি আজ তাঁকে ভালোভাবে কাঁদার সুযোগ দাও। কারণ হলো, তাঁর শ্রদ্ধেয় আব্বাজানও এভাবে তাহাজ্জুদ নামাযে হেঁচকি তুলে কাঁদতেন। তাঁর
কান্নার বরকতে মারকায ও মারকাযের মেহনতের ইজ্জত-আব্রু নিরাপদ ছিল। এখন তিনি নেই। কাজেই
তার ছেলে (মাওলানা যুবায়রুল হাসান সাহেবকে) এখন কাঁদতে হবে। যদি তিনি ক্রন্দন বন্ধ করে দেন তাহলে দুনিয়ার সবগুলো বাতিল এই মারকাযের ওপর প্রাধান্য
বিস্তার করবে।’এভাবে দীর্ঘক্ষণ অশ্রু বিসর্জনের পর একপর্যায়ে
মাওলানা যুবায়র সাহেব রহ. খানিকটা সুস্থির-স্বাভাবিক হন। আমি তখন তাঁকে নানাভাবে বুঝিয়ে
দোতলার খাবারের ঘরে নিয়ে যাই। সেখানে উঠেও তিনি দস্তরখানের পাশে বসে কাঁদতে লাগলেন।
কিছুতেই তাঁর মুখে খাবার উঠছিল না। তাঁকে এভাবে কাঁদতে দেখে দস্তরখানের সাথীগণও বিষন্ন
হয়ে পড়েন। ওই সময় অনেকের চোখ থেকেও টপটপ অশ্রু ঝরতে শুরু করেছিল। এ দিন (শনিবার) আসর
নামাযের পর মাওলানা .... হযরত যুবায়রুল হাসান রহ.-কে মেওয়াতের ইজতিমায় শরিক হওয়ার অনুরোধ
করেন। তখন তিনি পরিষ্কার যোগদানের অক্ষমতা জানিয়ে দেন।
পরদিন ৬ সফর রোববার
সকালের মাশওয়ারায় মাওলানা যুবায়রুল হাসান রহ. যদিও অংশগ্রহণ করেন; কিন্তু সেখানেও তাঁর চোখে-মুখে কান্নার
উপস্থিতি ছিল। অশ্রুসিক্ত নয়নেই তাঁর মুখ থেকে তখন এ শব্দ বেরোয়,
‘আব্বাজানের
ইনতিকালের পর থেকে আমার সঙ্গে যেই আচরণগুলো হচ্ছে তা আমার সহ্যের বাইরে। মাওলানা...
এদিকে কেন দৃষ্টি দিচ্ছেন না!’ এ দিন (রোববার) আসর নামাযের
পর ইজতিমার ময়দান থেকে পনেরো-বিশজন মেওয়াতি সাথী উপস্থিত হয় এবং মাওলানা রহ.কে নিজেদের
সঙ্গে করে ইজতিমাস্থলে নিয়ে যাওয়ার জন্যে অনেকক্ষণ সমাদর করে। সেদিন ঈশার নামাযের পর
ছাইসার লোকজনও এসেছিল। তারাও তাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে জোরাজুরি করেছিল; কিন্তু মাওলানা রহ. তাদেরকেও অক্ষমতা জানিয়ে দেন। এমন বিপর্যস্ত পরিস্থিতির
চতুর্ দিন সকালের মাশওয়ারায় মাওলানা .... মৌলভি
যুবায়র সাহেবকে সম্বোধন করে বলেন,
‘তিন-চার
দিন পূর্বে তো একটি গ্রুপের লোকজন এসেছিল। এখন শুনতে পাচ্ছি, দ্বিতীয় আরেকটি গ্রুপ এখানে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে।’এ ধরনের শ্লেষমাখা বিদ্রপাত্মক বাক্য মাওলানা যুবায়র সাহেব বরদাশত করতে
পারেননি। তিনি তৎক্ষণাৎ বালিশের ওপর থেকে নিজের কোমর সরিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে উত্তর
দেন,
‘জ্বি না।
আপনি বিলকুল নিশ্চিন্ত থাকুন। এখানে একটি গ্রুপের লোকজনই আসতে থাকবে। দ্বিতীয় গ্রুপ
কখনই আসবে না।’ মাওলানা রহ. এর মুখ থেকে বেরোনো এ কথাটির সততা
ও সম্মান আল্লাহ তাআলা মৃত্যু পর্যন্ত বহাল রেখেছেন। যার ফলে দেখা গেছে, মারকাযে সবসময় একটি গ্রুপের লোকজনই ভিড় করেছে। এ ঘটনা বিশ্ববাসীর সামনে
স্পষ্টাকারে জানিয়ে দিয়েছে যে, কারা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে
আর কারা বাতিল ও অন্যায়ের পক্ষে। এমনকি আজ একুশ বছর পরও আল্লাহ তাআলা সেই বাপ-বেটার
কান্নার বরকতে গোটা দুনিয়াবাসীর চোখের সামনে সত্য ও মিথ্যার মাঝবরবার পরিষ্কার বিভাজন
রেখা টেনে রেখেছেন।
এই হৃদয়বিদারক
ইতিহাস বাস্তবেই অপূর্ণ থেকে যাবে, যদি পাঠকগণ এই সর্বশেষ তথ্যটুকু না পড়েন। এ ঘটনার পর দিল্লির একজন আধাধার্মিক,
আধা রাজনীতিবিদ প্রতাপশালী ব্যক্তি মাওলানা যুবায়র রহ. এর কাছে এ
মর্মে বার্তা পাঠান যে,
‘কয়েক দিন
পূর্বে মারকাযে আপনার সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে, তা শুনে আমি যারপরনেই
ব্যথিত। আমি বিশাল জনগোষ্ঠী ও লিডারদের সঙ্গে নিয়ে মারকাযে আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করার
অনুমতি চাই’। মাওলানা রহ. যেহেতু ওই সময় প্রচন্ড ব্যথিত ও বিষন্ন ছিলেন এজন্যে তিনি নিজেই এর উত্তর না দিয়ে অন্দরমহল থেকে
আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি হাজির হলাম। তিনি আমাকে বলেন, ‘এক
লোক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিয়ে এসেছে। তুমি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যা ইচ্ছে জানিয়ে দাও।’
আমি নিরেট আল্লাহর দেওয়া তাওফিকের শক্তিতে বলিয়ান হয়ে পূর্ণ সাহসের
সঙ্গে ওই ব্যক্তির প্রস্তাব শুনে দাঁড়ানো অবস্থাতেই এ উত্তর দিলাম, ‘আমাদের দু’জনের পক্ষ থেকে তাকে সালাম জানাবেন।
তার এই ভালোবাসা ও আন্তরিকতার ওপর আমাদের পক্ষ থেকে শুকরিয়া জানিয়ে বলবেন যে,
ফিলহাল এ ধরনের সহযোগিতার প্রয়োজন নেই। আল্লাহ তাআলা আপনাকেও নিরাপদ
রাখুন, আমাদেরকেও নিরাপদ রাখুন।’ এই বিশাল জিহাদ সামাল দেওয়ার প্রায় দু’ সপ্তাহ
পর দিল্লিতে কয়েকজন চিন্তাবিদ ও দূরদর্শী ব্যক্তি পর্যালোচনা বৈঠক আয়োজন করেন। সেখানে
বিদ্যমান হাঙ্গামার কারণে ‘আমরা কী পেয়েছি ও কী হারিয়েছি?’
শীর্ষক প্রশ্ন ওঠে। মজলিসে অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেকেই এ বিষয়ে নিজ
নিজ অভিমত পেশ করে। বিষয়টি নিয়ে যখন আমাকে প্রশ্ন করা হয় তখন আমি আমার অভিমত পেশ করে
বলি, ‘এই পুরো ঘটনায় অধমের মতে মাওলানা যুবায়রুল হাসান রহ.
এর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, তিনি তার পক্ষে কোনো গ্রুপ তৈরি
হতে দেননি এবং অন্য গ্রুপের কর্মকান্ডে বিন্দু পরিমাণ প্রভাবিত
হননি। তিনি তাঁর মৌনতার মাধ্যমে মারকাযের অসহায়ত্ব ও অক্ষমতা এবং ভবিষ্যতের নানা শঙ্কা
উপস্থিত লোকদেরকে জানাতে সক্ষম হয়েছেন।৫
______________________________________________________________________________________________________________________
২. হযরত মাওলানা ইনআমুল হাসান রহ. এর ডায়েরি থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে
বুঝে আসে যে, মিরাঠের এই সাথীরা ১৯৭১ সাল থেকে সেই উদ্দেশ্য নিয়ে
মারকায যাতায়াত করতেন।
৩. চিঠিটি লেখা হয়েছিল ২ শাওয়াল ১৪১৬ হি./ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৬
ঈ.। উদ্ধৃতির জন্যে পড়ুন, মাওলানা মাহমুদ হাসান নদভির লেখা ‘তাযকিরায়ে মাওলানা যুবায়রুল হাসান রহ.।
৪. এগুলো হলো, দরবারের খাদেম ও সেবকদের
পদক্ষেপ। নয়তো এর আগে খোদ সাহেবযাদা নিজেই রায়ভেন্ডের ইজতিমায় শূরার সামনে বেশ জোরালোভাবে
ঠিক এ শব্দে এ সমস্যা উত্থাপন করেছিলেন যে, ‘যেহেতু মাওলানা
যুবায়রুল হাসান সাহেব প্রতিদিন বিভিন্ন জামাতের বিদায়ী দুআ পরিচালনা করে থাকেন এজন্যে
মানুষ তাকেই হযরতজি মনে করে। এজন্যে নিয়ম হোক, একদিন তিনি
দুআ করবেন। অন্যদিন আমি দুআ করব। এ প্রস্তাব সাহেবযাদা নিজেই বারবার উপস্থাপন করেছেন;
কিন্তু সেখানকার শূরার সাথীগণ কখনই তার সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি।
এটি ওই সময়কার কথা, যখন সাহেবযাদা তার নিজের প্রতিটি চাওয়া
পূরণ করতে ও নিজের যেকোনো সমস্যার সমাধানের জন্যে রায়ভেণ্ডকেই নিজের কেবলা কাবা মনে
করতেন। যার কারণে দেখা যায়, বাড়ি বাটোয়ারা, বড় বড় ইজতিমাগুলোতে দুআ-মুসাফাহা, বাইরের বিভিনড়ব
হুজরার ওপর নিয়ন্ত্রণ-সহ এ জাতীয় সবগুলো বিষয় তিনি নিজেই যেমন রায়ভেন্ড শূরার কাছে
গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন; তেমনই নিজের আমলাদেরকে দিয়েও
উপস্থাপন করিয়েছেন। কিন্তু এখন তো ....। এটি সেই সময়কার কথা, যখন অগিড়বলাভাগুলো টকটকে লাল রং ধারণ করে জ্বলছিল।
৫. এখানে ‘বিশাল জিহাদ’ শব্দে বোঝানো হয়েছে, যেই কাণ্ডগুলো সফর ১৪১৭ হি.
মুতাবেক জুন ১৯৯৬ ঈ. ঘটেছিল। কিন্তু ১৪৩৭ হিজরির পবিত্র রমাযান চলাকালে মারকাযে যেই
কাণ্ড ঘটেছে, তা সামনে রাখলে যেকোনো বুদ্ধিমান লোক এ সিদ্ধান্তে
উপনীত হবেন যে, আমরা কিছ্ইু পাইনি; বরং সর্বস্ব খুইয়েছি।
_____________________________________________________
মাওলানা
যুবায়রুল হাসান কান্ধলভি রহ. / অব্যক্ত বেদনার বিস্মৃত ইতিহাস- পৃষ্ঠা নম্বর ১১-১৫
0 কমেন্টসগুলো:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন