কিছু দিন আগে ৭১'র টিভিতে মুফতী ফয়জুল্লাহ সাহেবের সাথে কাকরাইলের যে লোকটি মাও: সাদ সাহেব কে ইজতেমায় নেয়ার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে ইনিয়ে বিনিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করার অপচেষ্টা করেছেন, সেটা সাদ সাহেবের অন্ধভক্ত আমাদের দ্বীনী ভাইদের প্রতি একটা 'অশুভ ব্ল্যাক ম্যাসেজ' বলে আমি মনে করি।
এটা বাংলাদেশের দ্বীনদার মানুষের প্রতি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অনেক বড় নেয়ামত। মহামহীম আল্লাহ শেখ রাসেলের সহপাঠী ঐ ভাইটির বক্তব্যের মাধ্যমে সত্য প্রকাশ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর সোনার ছেলে-মেয়েরা যেভাবে বহি:র্বিশ্বে দেশের সুনাম কুড়িয়ে আনছে-বিশ্ব ইজতেমার মাধ্যমেও এই দেশে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে! বিশ্ব ইজতেমা মাও: সাদ সাহেবের নেতৃত্বে না হলে নাকি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বহি:র্বিশ্বে লজ্জিত হবে! ইজতেমা আগামী বৎসরই অন্য দেশে চলে যাবে! যুগযুগ ধরে নবুওয়াতী এই মেহনতের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা এসব রাজনৈতিক ও দুনিয়াবী স্বার্থান্ধ 'পোশাকী দ্বীনদার'দের বিষাক্ত মুখোশ খোদাপাক আজ খোলে দিয়েছেন।
সাধারণ তাবলীগী ভাইদের জন্য এই ঘটনায় রয়েছে পরিস্কার সতর্ক বার্তা। এই গ্রুপটি জান মালের সর্বোচ্চ কুরবানী আর অগণিত মানুষের রোনাজারীর ফসল তাবলীগের মেহনত কে রাজনীতি নামক দুনিয়াবী নষ্টামী দ্বারা কলুষিত করতে চায়। তাই সাধারণ মুসলমানদের দ্বীনী পথ নির্দেশক উলামায়ে দেওবন্দ কোন 'হ্যামিলনের বাঁশীওয়ালা'দের হাতে এতবড় মকবুল কাজ কে ছেড়ে দিতে পারেন না। মাও: সাদ সাহেব উলামাদের একরাম করতে বলেন। কিন্তু ওয়াসিফ সাহেবের লোকজন সে সকল উলামাদের কে সম্মান করতে চান, যারা সাল বা তিন চিল্লা'র সাথী। তাদের কাছে ঐ সকল শাইখুল হাদীসও বরিত নন, যারা এই কাজের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত নন। তাদের কূপমন্ডুপ চেতনা হলো, ছয় উসুল ভিত্তিক তবলীগী কাজটাই একমাত্র দ্বীন! মাদ্রাসার মেহনত, খানকার মেহনত, লেখা লেখির মেহনত-এসব ইনফিরাদী মেহনত। ইনফিরাদী মেহনত দ্বারা দ্বীনের নুসরত হয়না!
দ্বীনের একমাত্র নুসরত হয় এই তরিকা (ছয় উসুল ভিত্তিক) দ্বারা! এই অদ্ভূত চেতনাগুলো তবলীগে এসেছে মাও: সাদ সাহেবের বয়ান থেকে। মাও:সাদ সাহেবের এ সব তাজদীদী! ও ইলহামী বয়ানগুলো অধমের সরাসরি শোনার তওফীক হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, ফাজায়েলে আ'মাল সহ তাবলীগী নেসাবের অধিকাংশ বইয়ের লেখক শাইখুল ইসলাম আল্লামা জাকারিয়া রহ: এই তরিকায় তিনদিনের জন্যও আল্লার রাস্তায় বের হননি। ফাজায়েলে আ'মালের অসংখ্য জায়গায় তিনি মাদ্রাসার মেহনত কে, খানকার মেহনত কে দ্বীনের অপরিহার্য অংশ সাব্যস্ত করেছেন। যে তাসাওফের মেহনতের প্রতি হযরতওয়ালা সাদ সাহেবের এত 'গোস্বা', সেই মেহনতের যুগান্তকারী অবদানের কথা, আল্লাহর অলীদের শত শত কারামতের কথা ফাজায়েলে আমালের পাতায় পাতায় বর্ণনা করা হয়েছে। এ কারণেই হয়তো
হযরতওয়ালা সাদ সাহেব ফাজায়েলে আামাল কে তবলীগী নেসাব থেকে উচ্ছেদ করতে চান!
আরও মজার ব্যাপার হলো, এখন মাও: সাদ সাহেব নিজই বায়আত করা শুরু করেছেন। (যদিও নিজামুদ্দীন মারকাজে পূর্বের হযরতজী বাইআত করতে নিষেধ করে গেছেন) কাকরাইলেও সেদিন হযরতওয়ালা উপস্থিত সবাই কে বাইআত করে নিয়েছেন!
আরো মজার ব্যাপার হলো, হযরতজী ইলিয়াস রহ: এর জামানায় উসুল ছিল তিনটি। ছয় উসুলের তাবলীগই যদি একমাত্র দ্বীন হয়, তবে তো প্রতিষ্ঠাতার মেহনতের উপরই প্রশ্ন আসবে?
মাও: সাদ সাহেব ওয়াজ মাহফিলের প্রতি খুবই রুষ্ট। আমি শেখ জাকারিয়া রহ: এর 'আপবীতি'তে পড়েছি, সাহারানপুর মাদ্রাসার বার্ষিক মাহফিল ইলিয়াস রহ: এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হত। যে বৎসর তিনি মাহফিলে যেতে পারতেন না, সে বৎসর ঐ মাদ্রাসার মাহফিলই স্থগিত হয়ে যেত! বুযুর্গানে দ্বীন এত মুত্তাকী ও পরহেযগার হওয়া সত্ত্বেও মাদ্রাসায় পড়িয়ে বেতন নেওয়াকে তাকওয়ার খেলাফও মনে করতেন না। ওয়াজ করে আকাবিরদের হাদিয়া গ্রহণের কথা শেখ জাকারিয়া রহ: এর আত্মজীবনী আপবীতি সহ আকাবিরদের অসংখ্য কিতাবাদিতে দেখতে পাওয়া যায়। ইলিয়াস রহ: এর এই পদ্ধতি চালু করার আগে হাজার হাজার আকাবির ও আসলাফ ছয় উসুলের তাবলীগ ছাড়া কুরআন সুন্নাহর আলোকে নিজ নিজ তরিকায় তাবলীগের কাজ করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। তারা কী পূর্ণ দ্বীনের উপর আমল করে যেতে পারেননি?
ইলিয়াস রহ: থেকে নিয়ে মাও: সাদ সাহেবের দায়িত্ব আসার পূর্ব পর্যন্ত কোন কালেই আকাবির ও আসলাফের এ সব দ্বীনী কর্মকান্ডের সাথে তবলীগের তিন উসুল বা ছয় উসুলের সংঘর্ষ হয়নি। হওয়ার কথাও নয়। সাহারানপুরের এক ইজতেমায় যেতে গিয়ে মাদানী রহ: এর সাথে হযরত জী'র দেখা হয়ে গেল। হযরত জী বললেন, হযরতওয়ালা কোথায় রওয়ানা?
মাদানী রহ: বললেন, একটা সম্মেলনে যাচ্ছি। হযরত জী বললেন, আমিও যাব আপনার সাথে। গেলেনও।
এরপর ঐ রাজনৈতিক সভা শেষে মাদানী রহ: মাও: ইলিয়াস রহ: এর ইজতেমায় এসে যোগ দিলেন একসাথে। বয়ানও করলেন। তখনতো তবলীগের উসুলের সাথে অন্যান্য মেহনতের কোন সমস্যা হয়নি!
কিন্তু নিজামুদ্দীনের স্ব ঘোষিত হযরতওয়ালা আমীর মাও: সাদ সাহেব যখন এসব বিষয়ে অত্যধিক মাত্রায় বাড়াবাড়ি করতে লাগলেন, পূর্বসূরীদের মত পথ এমনকি অনেক জায়গায় ফেকহে হানাফীর অকাট্য সিদ্ধান্তকৃত মাসআলার উল্টা নিজস্ব উদ্ভাবিত মাসআলা বর্ণনা করতে লাগলেন, এবং এ ক্ষেত্রে তাঁ রই হাদীসের উস্তাদ মাও: আহমদ লাট ও মাও: ইব্রাহীম দেওলা সহ অন্যান্য উস্তাদদের সতর্ক করিয়ে দেওয়াকে আমলে নিলেন না, উল্টো তাদের কে বাদ দিয়ে তবলীগ কে নিজের উদ্ভাবিত মতের এক আজগুবি কায়দায় চালিয়ে একটি নতুন মতবাদের জন্ম দিতে চাইলেন, তখন উলামায়ে দেওবন্দ কুরআনের নির্দেশনা ( ﺍﺻﻠﺤﻮﺍ ﺫﺍﺕ ﺑﻴﻨﻜﻢ ) এর দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসলো।
আমার এক ভাই বার্মিংহামে থাকেন। তিনি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে বলেছেন, মাও: সাদ সাহেব ফরজ নামাজে রুকু থেকে দাঁড়িয়ে 'রাব্বানা লাকাল হামদ' এর পরে 'হামদান.......তাইয়্যিবান...... এবং দুই সেজদার মাঝের দুআ'টি নিজে পড়েন এবং অন্য কে পাঠ করতে বলেন! বর্ণনাকারী মাওলানা সাহেব হযরতওয়ালা কে বললেন, হযরত! আমাদের মাজহাবে তো এটা নফল নামাজে পড়া হয়, ফরজে নয়! সাদ সাহেব উত্তর দিলেন-আমি মুহাম্মদী!
এভাবে যে সব মাসআালায় হযরতওয়ালা ফেকহে হানাফীর উল্টা চলেন, সে সব বিষয়ে মাও: সাদ সাহেবের পক্ষীয় ভাইদের কে জিজ্ঞেস করলে-তারা দরাজ কণ্ঠে জবাব দেন- হজরতজী নাকি সরাসরি সাহাবায়ে কেরামের অনুসরণ করে চলেন!
জেনারেল শিক্ষিত ঐ ভাইদের কাছে বিষয়টি গর্বের। সচেতন উলামাদের কাছে বিষয়টি ভয়ের। এটা, এই কথাটা সীরাতে মুস্তাকীম থেকে দূরে সরে যাওয়ার একটা চোরাই পথ।
মাও: সাদ সাহেব কে নিয়ে উলামাদের শংকার জায়গা এটাই। কারণ সালাফী ও মওদুদী মতবাদ এহেন চিন্তাধারা থেকে সৃষ্টি হয়েছে।
আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানের আলোকে বললে, সাদ সাহেব কেন্দ্রিক সংকটের মূল জায়গা এটাই। রুজু হওয়া-না হওয়া এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কোন বিষয় নয়। দেওবন্দ ফতওয়া প্রকাশ করার আগে সাদ সাহেবের কাছে কয়েকবার প্রতিনিধি দল পাঠিয়েছে। চিঠি পাঠিয়ে ওয়াজাহাত জানতে চেয়েছে। তিনি তখন দেওবন্দের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করেছেন-
'কেন দেওবন্দ নিজামুদ্দীনের ব্যাপারে নাক গলাবে? নিজামুদ্দীন তো দেওবন্দের কোন বিষয়ে নাক গলায়না?'
মাও: সাদ সাহেবের এমন সদম্ভ মনোভাবের কারণে মুরুব্বী উলামাগণ মনে করছেন, তিনি তার শরীয়ত বিরোধী আকীদা থেকে মৌখিক রুজু করলেও তার সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করলে পরিস্কার প্রমাণিত হয়, তিনি নিজেকে 'মুজাদ্দিদ' এবং 'মুজতাহিদ' মনে করেন। ফলে সারা বিশ্বের লক্ষ কোটি মানুষের দ্বীনী বিষয়ের ইমারতের দায়িত্ব তার একক হাতে নিরাপদ মনে করেন না। এ জন্যই বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল মাও: সাদ সাহেবের কাছে গিয়ে 'রুজু'র বিষয়টি ততটা সামনে না এনে সম্মিলিতভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়া-তথা শূরায়ী পদ্ধতী'র বিষয়টি আলোকপাত করেন। এতে তিনি আগ্রহ দেখাননি। তিনি রুজুর বিষয়টি প্রমাণ করার জন্য বিভিন্ন কসরত দেখাচ্ছেন। দুআ'র মধ্যেও রুজু করে যাচ্ছেন! অথচ নিজামুদ্দীন থেকে দেওবন্দের প্রায় দুইশ কি.মি. পথ পাড়ি দিয়ে সরাসরি উলামায়ে দেওবন্দের সাথে বসে বিষয়টি খুব সহজেই মীমাংসা করে ফেলতে পারেন। তারাও তখন যেভাবে ফতওয়া প্রকাশ করা হয়েছিল, সেভাবে রুজু নামাটি ওয়েব সাইটে প্রকাশ করে দিয়ে দায়িত্বমুক্ত হতে পারেন।
কিন্তু সেটা তিনি করছেন না কেন?
অহংবোধ?
আমি জানিনা। আল্লাহপাক বেশি জানেন।
অনেকেই বলছেন, দেওবন্দের মুহতামিম সাহেব নাকি বলেছেন, মাও: সাদ সাহেব রুজু করেছেন। তাঁর ব্যাপারে দেওবন্দের আর কোন আপত্তি নাই! কিন্তু এসবই মুখের কথা। এখনও পর্যন্ত দেওবন্দের ওয়েবসাইটে মাও: সাদ সাহেবের রুজুর ব্যাপারে "হাম মুতমায়িন নেহী" এ কথা লেখা আছে।
দেওবন্দের অনাপত্তির দাবীদার ভাইদের কে বলবো,
"হাম মুতমায়িন হে" এ কথা লেখার কী কোন দায়িত্বশীল দেওবন্দে নেই?
অনেকেই অজ্ঞতাবশত: দারুল উলুম দেওবন্দের সমালোচনা করেন।
'দেওবন্দ এই কাজ করতে গেল কেন?'
ভাই, আপনি যদি দেওবন্দ কে এলাকার একটা বড় কওমী মাদ্রাসার মতই মনে করেন, তবে ভুল করবেন।
দেওবন্দ হযরত জী ইলিয়াস রহ: কে জন্ম দিয়েছিল বলেই আপনি আজ দ্বীনদার। দেওবন্দ কেবল একটি মাদ্রাসা নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। একটি হকের পতাকাবাহী আন্দোলন। যারা দেওবন্দ কে বাদ দিয়ে দ্বীনের পথে চলতে চায়, তাদের ব্যাপারে বাংলাদেশের উলামায়ে কেরাম বাঁধা হয়ে দাঁড়াবেনই। কারণ আপনার খারাপ লাগলেও কুরআন হাদীসের ভাষ্যমতে উলামায়ে কেরাম দ্বীনের পাহারাদার। পাহারাদার সজাগ থাকতে হয়। ঘুমিয়ে গেলে বিনাশী ডাকাত প্রবেশ করে দ্বীন ধর্মের বারটা বাজিয়ে দিবে। এবং এই পাহারাদাী করতে গিয়েই অনেক সময় অনেক কিছুর চ্যালেঞ্জ করতে হয়। কখনো কঠোর হতে হয়। কখনো রক্ত দিতে হয়। এই পাহারাদাররা আপনাদের মত জেনারেল শিক্ষিত দ্বীনদার ভাইদের জন্য-সর্বোপরি সাধারণ মুসলিম জনগণের নিরাপদ দ্বীনের পবিত্র শরীর টাকে শিরক বিদাত নামক বিধ্বংসী জিনিস থেকে বাঁচানোর জন্য, এই উলামায়ে দেওবন্দ কখনো ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলে গেছেন। কখনও বন্দী শিবিরে ধুঁকে ধুঁকে নিজের জীবন কে বিলিয়ে দিয়েছেন। কখনো জালেম শাসকের সামনে হক কথা বলে উত্তম জিহাদটিও এই পাহারাদারদেরই করতে হয়।
কাজেই উলামাদের সম্পর্কে, দেওবন্দ সম্পর্কে কটূক্তি করার আগে আল্লাহ কে ভয় করুন।
কিছু কথিত কওমী আলেম কেও দেওবন্দ সম্পর্কে বিষোদগার করতে দেখেছি। আমি মনে করি, ঘোষণা দিয়ে উলামায়ে দেওবন্দের ধারা থেকেঐ সকল বুযর্গদের! বেরিয়ে যাওয়া উচিত।
জাবের আল হুদা চৌধুরী, হবিগঞ্জ।
0 কমেন্টসগুলো:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন