মাওলানা যুবায়রুল হাসান রহ.-এর ধৈর্য,
সংযম ও নিরবচ্ছিনড়ব
নীরবতা
=========================
কিন্তু পৃথিবী
এখনো স্বীকার করে যে, এমন কঠিন ও বিপদসংকুল পরিস্থিতিতেও মাওলানা যুবায়রুল হাসান রহ. অবিচলতা, দৃঢ়তা, হিম্মত ও আল্লাহর প্রতিটি সিদ্ধান্তের
ওপর ধৈর্যের প্রতিমূর্তি হয়ে ছিলেন। চোখের সামনে অসংখ্য অপ্রিয় কান্ড ও অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটতে দেখেছেন;
তারপরও তাঁর মুখে একটিবারের জন্যেও কোনো অভিযোগ বা নালিশ জড়ানো শব্দ উঠে আসেনি।
তিনি
চাইলে ওই সময় পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে অনেক পরিকল্পনা দাঁড় করাতে পারতেন; কিন্তু তিনি আদৌ তা করেননি। নিযামু্দ্দিনের চৌহদ্দির ভেতর থেকে তাঁর শ্রদ্ধেয়
আব্বাজান মাওলানা ইনআমুল হাসান রহ. এর নাম-নিশানা ও অবদান মুছে ফেলার একের পর এক চেষ্টা
চোখের সামনে ঘটতে দেখেছেন, এমনকি খোদ মাওলানা যুবায়রুল হাসান
রহ.-কে নিযামুদ্দিনের চতুঃর্সীমার ভেতর নিঃস্ক্রিয় করে তোলার
জোর চেষ্টা চলেছে। তার সঙ্গে বারবার অবমাননাকর আচরণ করা হয়েছে। পদে পদে তাকে এ কথা
বোঝানো হয়েছে যে, আমাদের
কাছে এই চতুঃর্সীমার ভেতর আপনার অস্তিত্ব থাকা-না থাকা দুটোই সমান।
গতকাল যেমন আমাদের কাছে আপনার শ্রদ্ধেয় আব্বাজানের কোনো প্রয়োজন ছিল না, তেমনই আজও আমাদের কাছে
আপনারও কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু আল্লাহপ্রদত্ত ধৈর্য ও সংযমের অসাধারণ ক্ষমতাবলে এই
মহান লোকটি প্রতিদিন সকাল নয়টা মারকাযি শূরার বৈঠকে পূর্ণ হাসিমুখ ও প্রশান্ত চেহারা
নিয়ে হাজির হতেন। কিন্তু সেখানে তার ব্যক্তিসত্তার সঙ্গে যেই আচরণ হতো, বা দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের কর্মপন্থা
নিয়ে যেসব কান্ড ঘটতো, সেগুলো
দেখে তিনি দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে বাসায় ফিরে আসতেন। তিনি মাশওয়ারার
মাঝে প্রতিদিন এমন স্বৈরাচারী মনোভাবের বাছ-বিচারহীন প্রদর্শনী দেখেও চুপ থাকতেন। মুখ
ফুটে কিছুই বলতেন না। ধৈর্যের বাইরে চলে গেলে বড়জোর কয়েকদিন তিনি মাশওয়ারায় হাজির হতেন
না। শ্রদ্ধেয় আব্বাজান রহ. এর ইনতিকালের পর তিনি বুঝে ফেলেন,
এখন থেকে আমাকে যেকোনো সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে, নিজেকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে হবে। তখন থেকে তিনি নীরবতা ও মৌনতাকে নিজের
অভ্যাস বানিয়ে নেন। তিনি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মারকাযে সব কর্মকার্তা ঘটতে দেখতেন, সব কথা শুনতেন; কিন্তু ঠোঁটের ওপর মৌনতার সিলমহর এঁটে এক মুহূর্তের জন্যেও নীরবতা ভাঙতেন
না। মূলত তিনি এ ধরনের নীরবতা অবলম্বন করতেন স্বপেড়ব শ্রদ্ধেয় আব্বাজান রহ. এর কাছ
থেকে একটি নির্দেশনা পেয়ে, যেখানে তিনি বলেছিলেন,
‘যুবায়র
ও শাহেদ-কে এ কথা বলে দেবেন যে, তারা যেন যবান বন্ধ রাখে;
তবে যেন দেখে যায়, কে কী করছে?’
একদিনের ঘটনা। বরাবরের মতো শূরার বিব্রতকর বৈঠক শেষ করে তিনি যখন তার হুজরায় ফিরে
এলেন, ওই সময় তার চোখে-মুখে মাশওয়ারার মজলিসে ঘটে যাওয়া কান্ড-কারখানার কারণে স্পষ্টত
ছাপ পড়েছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে তৃতীয় হযতরজি রহ. এর কিছু খাস শিষ্য হুজরার ভেতরে প্রবেশ করে বর্তমান পরিস্থিতির ওপর
তাদের নিজস্ব অনুভূতি ব্যক্ত করে হযরতের মুখ থেকে মন্তব্য শোনার আগ্রহ পেশ করলো। ওই সময় হযরতের দু’চোখ জ্বলে ওঠেছিল। সংযমের
বাঁধ ভেঙে তিনি কিছু কথা বলার উপক্রম হয়ে পড়েছিলেন। আমি
সেসময় হুজরাখানায় উপস্থিত ছিলাম। হযরতের মুখ খোলার আগেই আমি বিখ্যাত ফারসি কবি
‘খাকানি’এর কিছু কবিতা আবৃত্তি করে শোনালাম। কবিতাগুলো শুনে সেই মজলিসের অন্য সাথীদের বিক্ষুদ্ধ আবেগ-উত্তেজনা
তৎক্ষণাৎ শীতল হয়ে গেল এবং বৈঠকের আলোচনার গতিমুখও বদলে গেল।
খাকানির সেই কবিতাগুলো আপনারাও শুনে নিন-
قل هو الله كه وصف
خالق ما است زير تبت يدا ابي لهب است گر فر وتر نشست خاقاني نے مرا ننگ نے ترا ادب
است
তাঁর উপস্থিতিতে তাঁর চোখের সামনে প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর শ্রদ্ধেয় আব্বাজান রহ.-এর
৩২ বছরের নেতৃত্বকালে গৃহীত দাওয়াত ও মেহনতের প্রতিটি পদক্ষেপের বিরোধিতা করা হতো। সারাক্ষণ সেখানকার মিম্বার
ও মেহরাব থেকে এ ধ্বনি উচ্চারিত হতো যে, ‘তাঁর ৩২ বছরের নেতৃত্বকালে
মেহনতের মাঝে যেসব অসঙ্গতি ও বিকৃতি অনুপ্রবেশ করে, তা আমি ধীরে ধীরে দূর করব।’ সাহেবযাদা সাহেব (মাওলানা মুহাম্মদ সাদ সাহেব) প্রকাশ্যে সবার সামনে বয়ানের মাঝে
এ ঘোষণা করতেন যে, ‘মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ সাহেব
রহ. পর্যন্ত এই মেহনত ছিল দাওয়াতি ও তাবলীগি মেহনত। পরবর্তীকালের
লোকেরা একে ‘সংগঠন ও আন্দোলন’ বানিয়ে ফেলেছে।’ তার মুখ থেকে এ সব কথা শুনে যেখানে সাধারণ শ্রোতারা নিজেদেরকে ধরে রাখতে পারত না, সেখানে এ জাতীয় কথা মাওলানা রহ.-কে কী পরিমাণ কষ্ট দিতো,
তা আর বলার
অপেক্ষা রাখে না। প্রতিদিনের বয়ানের মাঝে অঘোষিতভাবে
এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল যে,
কোনোভাবেই
তৃতীয় হযরতজির নাম নেওয়া যাবে না, তাঁর নেতৃত্বে দাওয়াত
ও তাবলীগের মেহনতে কী নীরব ব্যাপকতা এসেছে সে কথা বলা যাবে না; এমনকি দেশের সীমান্ত ছাড়িয়ে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোতে দাওয়াত ও তাবলীগের বিপুল সম্প্রসারণ ও ব্যাপকায়নের কথাও আলোচনা করা
যাবে না। এমন কষ্টদায়ক পরিস্থিতির কারণে আল্লাহর এই মহান বান্দা যদিও মনে মনে নীরবে অশ্রæ বিসর্জন দিয়েছেন; কিন্তু কখনই মুখ ফুটে
টু শব্দও করেননি। যদি তিনি সামান্য পরিমাণ শব্দ করতেন তাহলে নিঃসন্দেহে একটি বিশাল
বড় দুনিয়া তাঁকে সমর্থন জানিয়ে ময়দানে নেমে আসতো। কেননা দুনিয়া তখনো এ পরিমাণ অন্ধ হয়ে যায়নি যে, তারা তৃতীয় হযরতজি রহ.-এর অসামান্য মেহনত ও অবদানের কথা অস্বীকার করে বসবে।১
আল্লাহর কী কুদরত! তথাকথিত যেই দাবিদার এখন হযরতজির ৩২ বছরের অসঙ্গতি দূর করার
মিশনে নামার দাবি করে বেড়াচ্ছে, তাকে যদি তৃতীয় হযরতজির বিপুল
বিস্তৃত ব্যক্তিত্ব ও আধ্যাত্মিক প্রবল প্রতাপের সঙ্গে তুলনা করা হয় তাহলে দেখা যাবে, পথের ধুলোকে সূর্যের সঙ্গে তুলনা
করা হচ্ছে। সত্য তো এটাই যে,
لا تعْ مى الأبْ صارُ ، لوٰ كِ نْ ت عْ
مى ال ق ل وبُ ا ل تِ يْ في ال صدُ ور
‘দৃষ্টি কখনো অন্ধ হয় না; অন্ধ হয়ে ওই সব অন্তর, যা বুকের ভেতরে রয়েছে।’
বাস্তবতা হলো, বিগত বিশ-বাইশ বছর ধরে
নিযামুদ্দিনের মিম্বার হতে শায়খাইন (মাওলানা মুহাম্মদ ইলয়াস ও মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ (রহ.)-এর এমন বেশ কিছু মালফুযাত ও ইরশাদাত (বাণী) শোনা যাচ্ছে, যেগুলোর অধিকাংশ যেমন
প্রচলিত বই-পুস্তকে নেই, তেমনই এই নবোদ্ভূত কথাগুলো
তাঁর কাছের শিষ্যদেরও জানা নেই। এ কারণেই দেখা যায়, এই নতুন মালফুযাত গুলোর ঘ্রাণ খোদ নিযামুদ্দিনের চৌহদ্দির ভেতরেই ছড়াচ্ছে না।
মাওলানা ইসমাঈল
গোধরা, মাওলানা উসমান
কাকুসি, মাওলানা আবদুর রহমান রোয়ানা (মুম্বাই), ব্যাঙ্গলোরের জনাব ফারুক ভাই, মাদ্রাজের প্রফেসর
উসমান-সহ যেই পুরনো সাথীরা বিগত অর্ধশতাব্দী ধরে এই মুবারক মেহনতে নিজেদের জান-মাল
ও জীবন-যৌবন ব্যয় করেছেন, তাঁরা সম্মিলিতভাবে গত ২৫ শাওয়াল
১৪৩৭ হি. মুতাবেক ৩০ জুলাই ২০১৬ তারিখে দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতের যিম্মাদার হযরতগণ
ও জাতির সহমর্মী ব্যক্তিত্বদের নামে যেই চিঠি তৈরি করে হিন্দুস্তান, পাকিস্তান, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বেলজিয়াম,
মিসর, ফ্রান্স, ইয়ামান-সহ বিশ্বের বিভিনড়ব দেশের তাবলীগের যিম্মাদার হযরতগণের কাছে পাঠিয়েছিলেন,
সেই চিঠিতে তাঁরা তৃতীয় হযরতজি মাওলানা মুহাম্মদ ইনআমুল হাসান রহ.-এর
ব্যক্তিত্বকে কলুষিত করা এবং তাঁর সম্মান, মর্যাদা ও অবদান
মূল্যহীন বানানোর চলমান অপপ্রয়াসের কথা
ঠিক এ শব্দে বলেছেন―
‘কখনো মাওলানা
ইনআমুল হাসান সাহেব রহ.-এর ত্রিশ বছরের মুদ্দতকে ‘দাওয়াতের
নামে সংগঠন’ অভিহিত করে বিভ্রান্তি
ছড়ানো হচ্ছে। সর্বসাধারণের সামনে এ বয়ান করা হচ্ছে যে, ‘মাওলানা ইলয়াস সাহেব রহ. ও মাওলানা ইউসুফ
সাহেব রহ.-এর যুগে তাবলীগের মেহনত হয়েছে। তাদের পরবর্তীকালে এই মেহনত সংগঠনের রূপ ধারণ
করেছে।’
এ ধরনের বয়ানের
ফলে এখন এ ক্ষতি হয়েছে যে, একজন সাধারণ সাথীও অবলীলায় বলে বেড়াচ্ছে যে, মাওলানা ইনআমুল
হাসান সাহেব রহ. আগের দু’ হযরতজির দাওয়াত নিজেই বুঝতে পারেননি। তিনি তাঁর ত্রিশ বছরের আমলে এই
মেহনতকে বরবাদ করেছেন।’ এ কথা বললে অতিরঞ্জন
হবে না যে, এ ধরনের বস্তাপঁচা
মন্তব্য শুনতে পেয়ে বিগত ২০/২২ বছরের ভেতর দাওয়াত ও
তাবলীগের সাথীদের
হাজার হাজার চিঠি ইতোমধ্যে হিন্দুস্তান ও কাছের-দূরের অসংখ্য রাষ্ট্র থেকে এ ধরনের
চিঠি-পত্র বারংবার আমাদের
হস্তগত হয়েছে।
আপনিই বলুন, মাওলানা মুহাম্মদ ইনআমুল হাসান রহ.
কি তাঁর ত্রিশ বছরের ইমারতে কোনো ভালো কাজ করেননি! কোনো উল্লেখযোগ্য
অবদান রাখেননি!
অথচ তাঁর যুগেই এই মেহনতের বিপুল বিস্তৃতি ঘটেছে। তাঁর অস্তিত্ব এই
মেহনতের ময়দানে
এবং মেহনতের সাথীদের জীবনে এতো ব্যাপক বরকত বয়ে এনেছিলো যে, তাঁর ইনতিকালের পরপরই সাথীদের
অন্তরে দুর্বলতা, মেহনতের
মাঝে চরম বিশৃঙ্খলা ও নির্বিশেষে সমস্ত সাথীর অন্তরে হিম্মতশূন্যতা দেখা
দিয়েছে এবং তা
দিনদিন বেড়েই চলেছে। অথচ সেই শূন্যতা ভরাটের কোনো লক্ষণ অদ্যাবধি দেখা যাচ্ছে না। সারা পৃথিবীর মুবাল্লিগ
যিম্মাদারদের এ ধরনের ডজনখানেক বাহুল্যমুক্ত ও অতিরঞ্জন হীন চিঠি আমি নিজেই পড়েছি। এমন
অনেকগুলো চিঠি
খোদ আমার কাছেই সংরক্ষিত আছে। এ সময়ের একটি ঘটনা
বলছি। মেহনতের এক পুরনো সাথী অনেক বছর ধরে দিল্লি মারকাযের মুকিম। একদিন আমি খানিকটা আফসোসের
সঙ্গে তাঁকে বললাম, ‘মাঝে-মাঝে
তো আপনি নিজেই আপনার বয়ানের মাঝে হযরত মাওলানা ইনআমুল হাসান রহ.-এর নাম নিয়ে কোনো কথা বা তাঁর
কোনো ঘটনা বলতে পারেন’।
আমার এই অনুরোধ
শুনে তিনি বিষন্ন অবয়বে ওজর পেশ করে বললেন,
‘ভাই,
এক মাস-দু’ মাস পরে এক-আধবার বয়ান করার সুযোগ
পাই। এ ধরনের কথা বললে সেটাও হারিয়ে ফেলব।’
এই উত্তর শুনে
তাঁর ওজর এড়ানোর কোনো সুযোগ আমি আর পেলাম না। কেননা তিনি যা বলেছেন, সেটাই বাস্তব, সেটাই সত্য। আল্লাহর
কুদরত ও তাঁর গায়বি ব্যবস্থাপনার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত হলো, তৃতীয় হযরতজি রহ. এর যুগের
অসংখ্য উলামায়ে
কেরাম, মাশায়েখে দ্বীন
ও ক্বলবওয়ালা বুযুর্গ সর্বসম্মতি ক্রমে এই সরল স্বীকারোক্তি দিয়েছেন যে, তিনি পূর্বের দু’ হযরতের পদচিহ্ন পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসরণ
করে, তাঁদের যাবতীয় উসূল ও নকশা মেনে দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনতকে সারা পৃথিবীতে
ব্যাপকাকারে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন।
এর মজবুত সাক্ষী
হলো, তাঁর নেতৃত্বের
প্রথম দিকে যখন একটি চিহ্নিত
এলাকার কিছু লোক সম্পূর্ণরূপে বিদ্বেষের বিষবাষ্পে নীল হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে মোর্চা গড়ে তোলে এবং তার মন্দ প্রভাব মারকায নিযামুদ্দিনের
চৌহদ্দি পর্যন্ত চলে আসে তখন আল্লাহর প্রেমে প্রমত্ত আশেক হযরতজি ইনআমুল হাসান রহ. হযরত শায়খুল হাদিস রহ.
এর শরণাপন্ন হন এবং তাঁর কাছে এ অনুমতি প্রার্থনা করেন যে,
‘আমি নিযামুদ্দিন মারকায ত্যাগ
করে মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরত করার অনুমতি চাচ্ছি। সেখানে হযরত মাওলানা সাঈদ আহমদ খান সাহেব রহ.-এর সংস্পর্শে দাওয়াতের আমল করার অনুমতি দিন’।
হযরত শায়খুল হাদিস রহ. তখন দঢ়ৃ তার সঙ্গে তাঁর এই আবেদন নাকচ করে পরিষ্কার জানিয়ে
দেন যে, ‘মৌলভি ইনআম, কখনই এমনটি কোরো না। আমি ভালো করেই জানি যে, এ সময় মারকাযে এমন দ্বিতীয় কোনো ব্যক্তি নেই, যার মাঝে এই মেহনতের নেতৃত্ব
দেওয়ার যোগ্যতা ও সক্ষমতা রয়েছে’। যারা প্রবৃত্তির দাসত্ব করে বেড়ায়,
তাদের পক্ষেই
সম্ভব তাঁর আজীবনের ত্যাগ, ইখলাস ও কুরবানির বাস্তবতাকে
অস্বীকার করা। তারা কখনই এ সত্য স্বীকার করার সাহস দেখাতে পারেনি যে, হযরতের ব্যক্তিত্ব সবসময় এই মেহনতের ক্ষেত্রে স্বার্থের ঊর্ধ্বে ছিল। এরচেয়েও বড় সত্য হলো, একজন দক্ষ নাবিকের কল্যাণে শুধু জাহাজই ঝঞ্জাবিক্ষুব্ধ সাগরের তুফান থেকে নিরাপদে বন্দরে পৌঁছে না; বরং সেই জাহাজের যাত্রীদের
জীবন ও সম্পদও নিরাপদে পৌঁছে। কিন্তু কিছু হিংসুটে যাত্রী কখনই নাবিকের সেই কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে না।
কবির ভাষায়―‘আল্লাহ যেই জাহাজের হিফাযতের সিদ্ধান্ত
নেন খোদ ঝড় সেই জাহাজকে সমুদ্রের পাড়ে পৌঁছে দেয়।’
আল্লাহর ফয়সালা এখানেও সেই কুদরতি ব্যবস্থাপনায় আরেকবার দৃশ্যপটে চলে আসে। আলমি
শূরার অবয়বে মেহনতের জাহাজ স্থলভাগের কাছাকাছি ভিড়তে শুরু করেছে। সমুদ্রোপকূল ধীরে ধীরে চোখের সামনে
স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ব্যক্তিনির্ভর প্রশাসনের বিপরীতে সবার অংশগ্রহণমূলক প্রশাসন সামনে চলে আসছে। এভাবেই মহান আল্লাহ
হযরত মাওলানা ইনআমুল হাসান রহ.-এর ব্যক্তিত্বের মোহনীয় ক্ষমতায় বিপর্যয়গুলো উপড়ে ফেলে দিচ্ছেন। যেহেতু আমাদের এই আলোচনার শিরোনাম ছিল ‘ফেতনার প্লাবন’ সেহেতু আমরা মূল আলোচনায়
চলে যাচ্ছি। হযরত মাওলানা যুবায়রুল হাসান রহ. বিশ বছরের কর্মজীবনে কীভাবে ছোট-বড় শত শত ফেতনা ও অনাকাঙ্খিত ঘটনা
মুকাবিলা করেছেন, সেদিকে চলে যাচ্ছি। যেই
ফিতনাগুলো তাঁর জীবন থেকে একের পর এক পরীক্ষা নিয়েছে। আর সেই পরীক্ষাগুলোতে তিনি নিঃসঙ্গ অবিচলতা ও অভিযোগহীন সংযমের পরিচয় দিয়েছেন। আমরা পুরো ইতিহাস না টেনে শুধু এমন কিছু নির্দিষ্ট ফেতনার বিবরণ তুলে ধরবো, যেগুলো তাঁর ওপর কয়েক সপ্তাহ, এমনকি কয়েক মাস পর্যন্ত প্রভাব ফেলে রেখেছিল। কিন্তু এরপরও তিনি শুধু এ কথা ভেবে
বুক চেপে ধৈর্য ধারণ করে গেছেন যে, মারকায নিযামুদ্দিন ও মেহনতের
ঐক্যের ওপর যেন কোনো ধরনের আঁচ না পড়ে। যেন দাওয়াতের আব্রু-ইজ্জতের ওপর কালিমা না লেগে যায়। যত দুর্বল কাঠামোর সঙ্গেই হোক, তারপরও যেন সবার ঐক্য বজায় থাকে। আল্লাহ তাআলার কাছে পৃথিবীর কারো কোনো কাজ, কারো কোনো নিয়ত অজ্ঞাত নয়। তিনি পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের প্রতিটি স্পন্দন দেখেন ও জানেন। সেই আল্লাহ জাল্লা জালালুহুকে সাক্ষী করে বলছি, হযরত মাওলানা যুবায়রুল হাসান রহ.-কে আমি আমার এই জীবনে একটিবারও নিজের ব্যক্তিগত কোনো কারণে কাঁদতে দেখিনি; কিন্তু এই দাওয়াতি মেহনতের জন্যে অসংখ্যবার হেঁচকি তুলে কাঁদতে দেখেছি। আমি যখনই তাঁকে সান্ত¦না জানিয়ে দু’ কথা বলার চেষ্টা করেছি তিনি প্রতিবারই আমাকে এ উত্তর দিয়েছেন―
‘শাহেদ, আমার জীবন মারাত্মক সংকটের মুখে আছে। আমি যদি কিছু বলতে যাই
তাহলে ফেতনা দেখা দেবে, আর যদি চুপ থাকি তাহলে এই মেহনতের ক্ষতি হবে, যার যিম্মাদারি আমার ওপর দেওয়া হয়েছে।’
=========================================
মাওলানা যুবায়রুল হাসান কান্ধলভি রহ. / অব্যক্ত বেদনার বিস্মৃত ইতিহাস- পৃষ্ঠা নম্বর ৬-৯
১. তৃতীয় হযরতজি রহ. এর ইনতিকালের পর প্র ম কয়েক বছর সাহেবযাদার
মুখে এ ধরনের কথা শোনা যেত যে, ‘এই দাওয়াতি মেহনতের দু’জন দুশমন
রয়েছে। একজন
হলেন শায়খুল হাদিস রহ. যিনি আমার দাদার গদি মৌলভি ইনআমকে দিয়েছেন। অপরজন মৌলভি ইনআম, যিনি এই মেহনতকে আন্দোলনে পরিণত করেছেন।’
কিছু দিন তিনি বুঝতে পারলেন যে, তার এ ধরনের মন্তব্য খোদ
তার নিজের জন্যেই মারাত্মক বিপদজনক হয়ে দাঁড়াতে পারে। কেননা এ ধরনের মন্তব্যের মাধ্যমে একসঙ্গে দুজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে সংঘাতে
নামা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তখন থেকে তিনি হযরত শায়খুল হাদিস রহ. এর নাম সযতনে এড়িয়ে শুধু তৃতীয় হযরতজি রহ.কে টার্গেট বানিয়ে প্রকাশ্যে
নিজের বয়ানের মাঝে এ ধরনের মন্তব্য করে বেড়ানোর কাজ শুরু করে দেন।
0 কমেন্টসগুলো:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন