আমির না শুরা এ বিতর্ক থেকে শুরু হওয়া তাবলীগের সঙ্কট বর্তমানে তথাকথিত নেজামুদ্দীনের এতায়াত না আলমি শুরা এটি নিয়ে চলছে বেশ উত্তেজনা।
সাম্প্রতিক সময়ে এ বিতর্ক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। গতকাল শুক্রবার থেকে কাকরাইলে বাতেল সাদপন্থী ও আহালে হক্ক ওলামা একেরামদের মতাদর্শীদের মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করছিলো। তবে দুপুরে প্রশাসন ও শুরা সদস্যদের বৈঠকে সিদ্ধান্তের পর পরিস্থিতি শান্ত হয়ে আসে।
মিরপুর আকবর কমপ্লেক্স মাদরাসার মুহতামিম, দেশের শীর্ষ আলেম মুফতি দেলোয়ার হুসাইন বলেন, কাকরাইলের নিয়ন্ত্রণ বিজ্ঞ উলামাদের হাতে না থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
আরেকটি বড় কারণ হলো, মুরুব্বীদের না মানা। দিল্লির নিজামুদ্দীন মারকাজের মাওলানা সাদ কান্ধলভি যেমন তার বড় মুরুব্বী, উস্তাদদের মানছেন না বাংলাদেশেও তার অনুসারীরা উলামাদের মানছেন না। ফলে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটছে।
কাকরাইলের সমস্যা নিরসনে শীর্ষ উলামাদের একটি কমিটি করা হয়েছিলো। তবুও কেন সমাধানের কিছু দেখা যাচ্ছে না?
এমন প্রশ্নের জবাবে মুফতি দেলোয়ার হুসাইন বলেন, উলামাদের কমিটি হয়েছে, তারা সবাইকে নিয়ে বৈঠক করেছেন সব ঠিক আছে। কিন্তু বাতেলের গুপ্তচর সাদ অনুসারীরা তথা ওয়াসিফ গং আলেমদের সিদ্ধান্ত মানছে না।
তারা বৈঠকে এক কথা বলে, সবার সঙ্গে একমত হয়ে স্বাক্ষরও করে। কিন্তু দূরে গিয়ে উলামাদের কথার কোন তোয়াক্কা করেন না। আল্লামা মাহমুদুল হাসান, আল্লামা আশরাফ আলী, আল্লামা আবদুল কুদ্দুস এদের মতো শীর্ষ আলেমদের কথা যদি তারা মানতে না পারেন তাহলে কাদের কথায় তাবলীগ করবেন তা আমার বুঝে আসে না।
চলমান সমস্যার সমাধান কীভাবে হতে পারে? জানতে চাইলে তিনি বলেন,
সমাধান তো একদমই সহজ। আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি, কাকরাইলের সবাই যদি শীর্ষ আলেমদের পরামর্শ মেনে নেন, তাদের নির্দেশিত পথে মেহনতকে এগিয়ে নেন তাহলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। ইনশাআল্লাহ।
তাবলীগে সাল লাগানো আরেক আলেম বাসাবোর আবুজর গিফারী কমপ্লেক্সের পরিচালক মাওলানা আবদুর রাজ্জাক নদভি চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, কাকরাইলে যা ঘটছে তা খুবই দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক। একটি শান্ত ও ঐক্যবদ্ধ দীনি প্লাটফর্ম এমন অবস্থার শিকার হবে তা ভাবাই যায় না। তাবলীগ জামাত সবার আস্থার প্রতীক ছিলো। কিন্তু এখন আর সে আস্থা বাকি থাকবে বলে মনে হয় না।
সমস্যার বড় একটি কারণ হলো, মূল মানহাজ থেকে সরে আসা। মাওলানা সাদ কান্ধলভি এমন দৃষ্টিভঙ্গি লালান করেন যা তাবলীগের আকাবিরদের মানহাজের খেলাফ। তিনি বেশ কিছু বিষয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। যা দীনের ইনহেরাফের নামান্তর। যে কোনো দল বা জামাত যখন গোড়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় তখন সেখানে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এটাই স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, চলমান বিভক্তির কারণে তাবলিগ জামাতের যা ক্ষতি হচ্ছে তা পূরণ করা সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় শক্তি বিভক্ত হয়ে পড়লে তা শাখা প্রশাখায় ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশেও তাই হচ্ছে।
কাকরাইলে কেন এ সমস্যার সমাধান করা যাচ্ছে না?
কাকরাইলে যারা জিম্মাদার তাদের অধিকাংশ জেনারেল শিক্ষিত। আলেমের সংখ্যা কম। আবার আলেমদের চেয়ে জেনারেলদের প্রভাব বেশি। তাবলিগের কাজ শুরু হয়েছে আলেমদের হাতে, প্রতিষ্ঠাও পেয়েছে আলেমদের হাতে। যখন তাবলিগের জিম্মাদারি ননআলেমদের হাতে গেছে তখন থেকেই সমস্যার শুরু।
প্রফেসর, ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তাররা যদিও দীনের পথে এসে তাবলিগের মেহনতে যুক্ত হয়ে দাওয়াতে কাজ করেন কিন্তু একজন আলেম যে গভীর থেকে দীন বুঝেন, দীনের দরদ বুঝেন সেভাবে জেনারেল সাথীরা সেভাবে অনুধাবন করতে পারেন না।
এ জন্যই আলেম দরকার। আমি অবশ্যই তাদের সম্মন করি, স্বাগত জানাই। তারা আমাদের ভাই। আমার বলার উদ্দেশ্য হলো মূল জিম্মাদারি ও তদারকি আলেমদের হাতে থাকা উচিত।
বর্তমনে যে পরিস্থিতি তাতে মনে হচ্ছে না, কোনো পক্ষই সমাধান বা ঐক্য চাচ্ছে৷
চলমান সমস্যা সমাধানে আপনার কী পরামর্শ?
আমি মনে করি উলামায়ে কেরামের জোরালো ভূমিকা ছাড়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে না৷ তাই আওয়ার ইসলামের মাধ্যমে দীনের প্রতি দরদ ভালোবাসা রাখেন এমন সবার কাছে দরখাস্ত করতে চাই, দেশের শীর্ষ, বিজ্ঞ ও বিতর্কমুক্ত আলেমদের একটি কমিটি গঠন করে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সামাধানে ভূমিকা রাখুন৷
আলেমদের যে কমিটি বিশ্ব ইজতেমার আগে গঠন করা হয়েছিলো যদি তাদের মাধ্যমেও সমাধান হয় তাহলে তাদের পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ জানাবো৷
সাংবাদিক, প্রশাসন উলামায়ে কেরাম সবাইকে ভূমিকা রাখার আবেদন করবো৷ আমি একজন পুরাতন ও বহু দেশ সফরকারী সাথী হিসেবে সমস্যা সমাধানে যেকোনো খেদমত আঞ্জাম দিতে তৈরি আছি৷
আল্লাহ আমাদের মাঝে জোড় মিল মুহাব্বত বাড়িয়ে দিন, তাবলিগ জামাতকে সব ধরনের বিপদ থেকে হেফাজত করুন৷ আমিন৷
কাকরাইল মারকাজের অবস্থা থমথমে; পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দুই পক্ষের
গত দুই দিন ধরে বাংলাদেশের তাবলীগের মারকাজ কাকরাইল মসজিদে থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।কওমি মাদরাসার শিক্ষবর্ষ শেষে ছাত্র শিক্ষকদের তাবলীগে যাওয়ার উপলক্ষ্যে কাকরাইল মারকাজে ছাত্রদের ব্যাপক উপস্থিতি, তাবলীগের আম সাথীদের আসা এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করাসহ নানা ঘটনা ঘটে শুক্রবার দিনভর।
এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ এবং হাতাহাতিও হয়। পরে দায়িত্বরত পুলিশ এসে অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনে।
জানা যায়, দেশের কওমি মাদরাসাগুলো ছুটির কারণে কয়েক হাজার মাদরাসা ছাত্র কাকরাইলে জড়ো হয় তাবলীগে সময় দেয়ার জন্য। বৃহস্পতিবার থেকে তারা আসতে থাকে কাকরাইল মসজিদে।
এদিকে দিল্লির নিজামুদ্দীন মারকাজে অনুষ্ঠিত ১৬-১৯ এপ্রিল বাংলাদেশিদের জোড়ে যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল তা গতকাল সবার উপস্থিতিতে শোনানোর কথা ছিল। এ কারণে মাওলানা সাদপন্থীরাও জড়ো হন কাকরাইল মারকাজে।
গতকাল মারকাজে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা ছিল। দুপুরে মারকাজের ভেতরে মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ না করায় পুলিশ দুটি জ্যামার যন্ত্র উদ্ধার করেন।
লিল্লির নেজামুদ্দিন মারকাজের অনুসারীদের অভিযোগ, নেজামুদ্দিনের ফয়সালা যাতে কার্যকর করা না হয় এ কারণে ছাত্রদের আনা হয়েছে বিভিন্ন মাদরাসা থেকে। আর বাইরের কারো সঙ্গে যেন যোগাযোগ করা না যায় এ কারণে জ্যামার বসানো হয়েছিল।
তবে কাকরাইল মারকাজ শুরা সদস্য মাওলানা জুবায়ের আহমদের ছেলে মাওলানা হানজালা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, দেশের মাদরাসাগুলো রমজানের আগে বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্র শিক্ষক এবং আলেম উলামা এ সময় তাবলীগে সময় দেয়ার জন্য আসেন। তাদের আনার অভিযোগ ভিত্তিহীন।
জ্যামার বসানো বিষয়ে তিনি বলেন, নেজামুদ্দিনের অনুসারীরা পরামর্শে বসে কিছু না হতেই পুলিশ ডাকে। এ জন্য জ্যামার বসানো হয়েছিল।
জানা যায়, গতকাল কাকরাইলে জড়ো হওয়া আলেম উলামা ও শিক্ষার্থীরা কয়েকটি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ করেন।
এগুলো হলো,
১. মাওলানা সাদের কোনো ফয়সালা বাংলাদেশে মানা হবে না।
২. নিজামুদ্দিনের জোড়ে যে ২ জনকে বাংলাদেশের ফয়সাল নিযুক্ত করা হয়েছে তা কার্যকর করা যাবে না।
৩. কাকরাইলের কোনো সিদ্ধান্ত দুই তৃতীয়াংশ ফয়সারের সিদ্ধান্তেই কার্যকর হবে।
৪. কাকরাইলের কোনো চিঠি উলামা ফয়সালদের দস্তখত ছাড়া গ্রহণ হবে না।
কাকরাইল মারকাজের চলতি সপ্তাহের ফয়সাল মাওলানা রবিউল হক। তবে গতকাল তিনি এ সিদ্ধান্ত প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করেন বলে জানা যায়।
মাওলানা হানজালা বলেন, আলেমরা এসব সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য প্রস্তাব করেছেন তবে শুরা সদস্যরা আলেম উপদেষ্টাদের সঙ্গে কথা বলা ছাড়া এসব চূড়ান্ত করবেন না বলেই মত দিয়েছেন।
এদিকে আজ শনিবার সকালে মশওয়ারা চলাকালীন তথাকথিত নেজামুদ্দীনের অনুসারীরা বিভিন্ন হালকা থেকে মশওয়ারার কামড়ায় জড়ো হয়। এবং নেজামুদ্দীনের এতায়াতের বাইরের লোকদের উচ্চবাচ্চ করেন। এক পর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।
বিষয়টি সম্পর্কে সৈয়দ ওয়াসিফুল বলেন, গতকাল মাওলানা রবিউল হক সাহেবের ফয়সালাকৃত সিদ্ধান্ত ছিলো, নেজামুদ্দীন বা মাওলানা সাদের কোনো সিদ্ধান্ত বাংলাদেশে চলবে না। বিষয়টি ঢাকার হালকার সাথীদের কাছে জানাজানি হলে তারা এর প্রতিক্রিয়া জানাতে মারকাজে আসেন এবং মশওয়ারায় অংশ নেন।(তার বক্তব্য পুরোটাই মিথ্যা আসলে এটা তার চাল)
এদিকে সাদপন্থীরা বলে যায়, তারা যদি নেজামুদ্দীনের ফয়সালা না মানেন তবে কাকরাইলের ফয়সালাও তথাকথিত নেজামুদ্দীনের অনুসারীরা মানবেন না।
বিষয়গুলো নিয়ে আজ প্রশাসনের সঙ্গে শুরা সদস্যের বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সে বৈঠকে কী সিদ্ধান্ত হয় সেদিকেই তাকিয়ে আছেন হাজারও ধর্মপ্রাণ মানুষ।
এদিকে কাকরাইল মারকাজ ছাড়তে হচ্ছে মাওলানা জুবায়ের ও ওয়াসিফকে
কাকরাইল মারকাজের চলমান উত্তেজনা নিরসনে শুরা সদস্য এবং প্রশাসানের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আজ শনিবার দুপুরে তাবলীগ জামাতের কেন্দ্রীয় মারকাজ কাকরাইলে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠকে শুরার ৮ জন সদস্য এবং ডিবি’র প্রধান আবদুল বাতেন, রমনা থানার ডিসি মারুফসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন বলে জানান বৈঠকের সমন্বয়ক মাওলানা মাজহারুল ইসলাম।
কাওরান বাজার আম্বরশাহ মসজিদের খতিব মাওলানা মাজহার আরও জানান, বৈঠকে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। কাকরাইলের বর্তমান উত্তেজনাকর পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দেশের বাইরে থাকায় আপাতত দুটি সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তিনি আসার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বলে জানান মাওলানা মাজহারুল ইসলাম।
সিদ্ধান্ত দুটি হলো,
১. মাওলানা জুবায়ের আহমদ ও সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম চলতি মাসের ৩০ তারিখ পর্যন্ত মারকাজ মসজিদের বাইরে অবস্থান করবেন।
জানা যায়, মাওলানা জুবায়ের আহমদ শারীরীকভাবে কিছুটা অসুস্থতায়ও ভুগছেন।
২. দুইগ্রুপের চারজনকে সাময়িকভাবে মারকাজ মসজিদে যাতায়াতও নিষেধ করা হয়েছে। তারা হলেন, (নেজামুদ্দীন অনুসারী) মাওলানা আবদুল্লাহ (ধান্দাবাজ), ড. এরতেজা হাসান (ডিজিটাল জামাত কেডার)। (আলমি শুরার) ইঞ্জিয়ার মাহফুজ হান্নান ও আজগর আলী।
বৈঠকে শুরা সদ্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, মাওলানা জুবায়ের আহমদ, মাওলানা রবিউল হক, মাওলানা ওমর ফারুক, শেখ শিহাবুদ্দিন নাসিম, সৈয়দ ওয়াসিফুল ইসলাম, মাওলানা ফারুক প্রমুখ।
তাবলীগের মারকাজ মসজিদে বেশ কয়েকদিন ধরেই উত্তেজনা বিরাজ করছে। গতকাল শুক্রবার সেটি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালে হাতাহাতিও হয়। পরিবেশ শান্ত করার জন্য বাড়তি পুলিশ নিয়োজিত ছিল।
এদিকে আজ সকালে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে মসজিদে ছাত্রদের বের করে দেয় পুলিশ। তবে এর কিছুক্ষণ প্রশাসনের সিদ্ধান্ত এলে আবার তাদের প্রবেশ করানো হয়।





0 কমেন্টসগুলো:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন