কলকাতার পার্শ্ববর্তী অঞ্চল মোগরাহাটে একটি ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ইজতেমার শেষ দিন তাশকীল শেষ হওয়ার পর যখন জামাতগুলোর রুখসতের সময় হল তখন হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ ইউসুফ কান্ধলভী রাহঃ যথারীতি হেদায়েতি কথা বললেন।
হযরত মাওলানা মনযূর নুমানী রাহঃ কথাগুলো সংক্ষেপে নোট করেছিলেন। পরে তা সাজিয়ে লেখেন। এ প্রসঙ্গে তাঁর মন্তব্য-এই গোটা আলোচনার বিষয়বস্ত্ত হযরত মাওলানা মারহূমের। তবে ভাষা ও শব্দের বিষয়ে এ দাবি করা যায় না।
লেখাটিতে অলঙ্করণ করেছেন ড. আবদুর রাযযাক ইস্কান্দার।
আল্লাহ তা্আ'লার রেযামন্দি
আর এই আমলগুলো থেকে নূর শুধু তখনই পয়দা হবে যখন তা আল্লাহ তা্আ'লার রেযামন্দি ও আখিরাতের ছওয়াবের উদ্দেশ্যে করা হবে। আল্লাহ না করুন-যদি নিয়ত খাঁটি ও খালেস না হয় তাহলে এইসব আমলই হবে জাহান্নামে যাওয়ার কারণ।
হযরত আবু হুরায়রা রা.-এর মশহূর হাদীস-
আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন, কিয়ামতের দিন যখন এই তিন শ্রেণীর লোককে আল্লাহ তা্আ'লার সামনে হাজির করা হবে তখন আল্লাহ তাআ'লা বলবেন, আমি সবার মনের অবস্থা জানি। তোমরা এসব নেক আমল ও নূরানী আমল আমার রেযামন্দির জন্য করনি; বরং দুনিয়ার নাম-যশের জন্য করেছিলে। সে নাম-যশ তো তোমরা দুনিয়ায় পেয়েই গেছ। তাই এখানে তোমাদের জন্য কিছু নেই। এরপর তাদেরকে টেনে হিঁচড়ে জাহান্নামে ফেলে দেওয়া হবে।
হাদীস শরীফে একথাও বলা আছে যে, এরাই হবে সর্বপ্রথম জাহান্নামী। যাদের সম্পর্কে সবার আগে জাহান্নামের ফয়সালা করা হবে। (নাউযুবিল্লাহ)
চিন্তা করে দেখুন, কত ভয়াবহ এই হাদীস। হযরত আবু হুরায়রা রা. যখন এই হাদীস বর্ণনা করতেন তখন কোনো কোনো সময় ভয়ে চিৎকার করে উঠতেন এবং বেহুঁশ হয়ে যেতেন।
জনৈক ব্যক্তি এই হাদীসটি মুআবিয়া রা.-এর নিকট বর্ণনা করলে হযরত মুআবিয়া রা. এত কাঁদলেন যে, আশপাশের লোকদের আশঙ্কা হল, এখনই তাঁর প্রাণবায়ু বের হয়ে যাবে। অনেক্ষণ পর যখন তাঁর অবস্থা স্বাভাবিক হল তখন তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা সত্য বলেছেন এবং তাঁর রাসূল সঠিকভাবে তা জানিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি দুনিয়ার জীবন ও তার চাকচিক্য কামনা করবে আমি তার সকল কর্মের পূর্ণ
বিনিময় দুনিয়াতেই দিয়ে দিব এবং তাদেরকে কিছুমাত্র কম দেওয়া হবে না। এদের জন্য আখিরাতে আগুন ছাড়া আর কিছু নেই এবং ব্যর্থ হবে যা দুনিয়াতে করেছিল। যা তারা করত তা নিতান্তই পন্ডশ্রম।
মোটকথা, নূরানী আমল দ্বারা নূর তখনই পয়দা হবে যখন তা একমাত্র আল্লাহ তাআলার রেযামন্দির জন্য এবং আখিরাতের জন্য করা হবে। এজন্য আপনাকে যেমন পুরা সময় এসব আমলে মশগুল থাকতে হবে তেমনি নিয়তকেও সহীহ ও খালেস রাখতে হবে। শয়তান যখন কাউকে নেক আমল থেকে বিরত রাখতে পারে না তখন তার নিয়ত নষ্ট করার চেষ্টা করে। যে আমল আল্লাহর জন্য তা যদি গায়রুল্লাহর জন্য করা হয় তাহলে তার সাথে আল্লাহর নিসবত ও সম্পর্ক থাকে না। তেমনিভাবে যেসব আমলে আল্লাহর রেযামন্দি নেই তা যদি আল্লাহর রেযামন্দির উদ্দেশ্যে করা হয় তাহলে তাতে আল্লাহর নিসবত পয়দা হয় না এবং তার রেযামন্দি হাসিল হয় না। সুতরাং দুটো চেষ্টা করতে হবে :
আসল কাজ হল চারটি
আমি আগেই বলেছি যে, এ কাজে বের হওয়ার পর নিজেদেরকে শুধু চারটি কাজে নিয়োজিত রাখুন।
খুসুসী গাশতের সময় যদি দেখা যায়, যাকে দাওয়াত দিতে গিয়েছেন তিনি মনোযোগ দিয়ে কথা শুনতে প্রস্ত্তত নন তাহলে মোনাসিব উপায়ে কথা শেষ করে চলে আসা উচিত এবং তার জন্য দুআ করা উচিত। আর যদি দেখা যায়, তিনি মনোযোগ দিচ্ছেন তাহলে পুরা কথা তার সামনে রাখা চাই এবং কিছু সময় ফারেগ করার জন্যও দাওয়াত দেওয়া চাই।
খুসুসী গাশতে কোনো দ্বীনী আকাবিরের খেদমতে যাওয়া হলে তার কাছে শুধু দুআর আবেদন করা উচিত। তাকে যদি আগ্রহী ও মনোযোগী মনে হয় তাহলে কাজের কিছু কথাও (কারগুজারী) বলা যেতে পারে।
উমুমী গাশতের মাধ্যমে লোকদেরকে মসজিদে নিয়ে আসুন। তাদের সামনে ঈমান-ইয়াকীন, নামায, আল্লাহর যিকির, দ্বীনী ইলম, আখলাক ও দ্বীনী মেহনতের কথা আলোচনা করুন এবং তাশকীল করুন। তবে শুধু তাশকীল করেই সন্তুষ্ট থাকা যাবে না। যারা ওয়াদা করেছে ও নাম লিখিয়েছে তাদেরকে আল্লাহর রাস্তায় বের করার এবং ওয়াদাকে আমলে পরিণত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করুন এবং নিজেদের সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করুন, যেন তাদের সময়টুকু ভালোভাবে অতিবাহিত হয়। যারা এখন বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি তাদেরকে মাকামী গাশত, মাকামী ইজতেমায়ী তালীম, যিকির ও নামাযের পাবন্দির প্রতি উৎসাহিত করুন এবং এসব কাজের একটি নিযাম বানিয়ে দিন। যখন দাওয়াতের এ সকল মেহনত আপনি করলেন, এখন ঐ কৃষকের মতো, যে জমিতে বীজ বুনে আল্লাহর দরবারে হাত তোলে, আপনিও আকুতিমিনতির সাথে দুআ ও
রোনাযারিতে মশগুল হোন। আল্লাহ তাআলাই অন্তরের পরিবর্তনকারী। যাকে চান ঈমান ও ঈমানওয়ালা আমল দান করেন, যাকে চান মাহরূম রাখেন।
২. দাওয়াতের দ্বিতীয় কাজ তালীম।
যখন তালীমের জন্য বসবেন তো আদবের সাথে বসুন। আল্লাহর রাসূলের আনীত ইলমের প্রতি অন্তর যেন বিনীত থাকে। ফাযায়েলের মুযাকারা করুন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শিখানো দুআসমূহ মুখস্থ করুন।
৩ ও ৪. যে সময় দাওয়াত ও তালীম থাকবে না এবং অন্য কোনো প্রয়োজনীয় কাজও থাকবে না সে সময়ে নফল নামায পড়ুন কিংবা কুরআন মজীদ তেলাওয়াত করুন কিংবা যিকির-আযকারে মশগুল থাকুন। অথবা আল্লাহর কোনো বান্দার খেদমত করুন।
সফরের পুরো সময় এই কাজ আসল মাকসাদ বানিয়ে করা চাই এবং এত বেশি করা চাই যে, তা স্বভাবে পরিণত হয়।
এই আমলগুলো ইজতেমায়ীভাবেও করুন, আবার ইনফিরাদীভাবেও করুন। ইজতেমায়ীভাবে করার অর্থ হল, জামাতের নিয়ম অনুযায়ী করা। যেমন খুসুসী গাশত, উমুমী গাশত, জামাতের তালীমের সময় তালীম। জামাতের সাথে ফরয নামায ও তার আগে পরের সুন্নত। ইজতেমায়ী দায়িত্ব বণ্টন অনুসারে খাবার ইত্যাদির ব্যবস্থাপনা। এই সবগুলো হল ইজতেমায়ী আমল।
ইনফিরাদী দাওয়াত, ইনফিরাদী তালীম, ইনফিরাদী ইবাদত ও ইনফিরাদী খিদমতের অর্থ হচ্ছে ঐসব আমল, যা ইজতেমায়ী প্রোগ্রাম ছাড়া কেউ তার অবসর সময়ে করে, যে সময় তার উপর কোনো ইজতেমায়ী দায়িত্ব থাকে না। যেমন-দুপুরে খাওয়ার পর যোহরের নামায পর্যন্ত কোনো ইজতেমায়ী আমল, দাওয়াত, তালীম ইত্যাদি থাকে না। এ সময় প্রত্যেকের জন্য আরাম করার অনুমতি থাকে। কোনো আল্লাহর বান্দা যদি নিজের আরামের এই সময়টুকুতে কারো সাথে ঈমানী দাওয়াতের কথা বলে বা কোনো আল্লাহর বান্দাকে কোনো দুআ শেখায়, নামায সহীহ করে, কিংবা মসজিদের কোণায় নফল নামায পড়ে অথবা কোনো সাথীর খেদমত করে তাহলে এগুলো হবে ইনফিরাদী আমল।
মোটকথা, পুরো সফরে এই চারটি কাজ নিজের মাকসাদ ও মূল লক্ষ্য মনে করে করতে হবে এবং মানবীয় প্রয়োজন পূরণ ছাড়া বাকি পুরা সময় এইসব কাজেই মশগুল থাকতে হবে। তাহলেই ইনশাআল্লাহ জীবনে নূর আসবে। এরপর ইনশাআল্লাহ নূর ছড়িয়ে পড়বে।


0 কমেন্টসগুলো:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন