এখন কুরআনে যদি এমন কোন আমল/বিষয় পাওয়া যায়, যার বিপরীত আমল তাওয়াতুর সূত্রে হুযূর ﷺ থেকে প্রমাণিত হয়, তো কেউ এ কথা বলতে পারবে না যে, হাদীসের উপর আমলকারী এ ব্যক্তি কুরআনের বিরোধিতা করেছে। কেননা, আয়াতটি মানসুখও হতে পারে। তেমনি নবী ﷺ থেকেও একই বিষয়ে দুই ধরণের উক্তি পাওয়া গেলে বা মৌন সম্মতি পাওয়া গেলে এক্ষেত্রে একটি হাদীসের উপর আমলকারীকে কেউ এ কথা বলতে পারবে না যে, সে হাদীসের বিপরীত আমল করেছে। কেননা দু’টোই শুদ্ধ হতে পারে। মূল কথা হলো, চার মাযহাবের ইমামগণ পরবর্তী বর্ণিত বিপরীত সমস্যাকে কুরআন, হাদীস, ইজমা, কিয়াসের সমন্বয়ে উম্মতের সহজতার জন্য সুবিন্যস্তভাবে পেশ করেছেন। তা না হলে সমস্ত হাদীসের কিতাব অনুসন্ধান করে শুধু দুই রাকাত নামায কিভাবে পড়তে হয় তা বের করাও এই যুগের মানুষের পক্ষে অসম্ভব ছিল। তাই ইমামগণের কথা কোন নতুন শরীয়ত নয়। তাদের কথা মানা, মানে কুরআন হাদীসের কথা মানা। কেননা, তারা কুরআন হাদীস বুঝে, তার মর্মার্থ ও সারাংশ সুস্পষ্ট ভাবে আমাদের সামনে পেশ করেছেন। বস্তুতঃ তাদের কথা না মানলে কুরআন হাদীসও মানা হয় না। কেননা, এ যুগে এমন কোন মানুষ নেই, যিনি কুরআন হাদীস থেকে সমস্ত মাসআলা বের করে, পরস্পর বিরোধপূর্ণ হাদীস ও আয়াতের মধ্যে সামঞ্জস্যতা বিধান করে আমল করতে পারেন। তাছাড়া এ যুগে এক লক্ষ হাদীসও সনদসহ মুখস্ত বলতে পারেন, এমন ব্যক্তিত্ব খুঁজে পাওয়া বিরল। অথচ মাযহাবের ইমামগণ লক্ষ লক্ষ হাদীস সনদসহ মুখস্ত বলতে পারতেন।
যাহোক, এখন মূল জওয়াবের দিকে যাচ্ছি। মূলতঃ রাফয়ে ইয়াদাইনের বিষয়টি সাহাবা যুগ থেকে বিরোধপূর্ণ, তবে তা নামায হওয়া না হওয়া নিয়ে নয়, বরং উত্তম অনুত্তম নিয়ে। সাহাবা যুগেও কোন সাহাবা রাফয়ে ইয়াদাইন করতেন এবং কোন সাহাবা করতেন না। তবে তারা একে অপরকে খারাপ মনে করতেন না। কিন্তু এ যুগে মানুষ স্বীয় প্রবৃত্তির পেছনে পড়ে একে অপরকে ঘৃণা করে থাকে। পরস্পরের মধ্যে ফাটল ও দ্বন্ধ সৃষ্টি করে।
আর এবিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করা এবং যারা রাফয়ে ইয়াদাইন করে না, তাদেরকে আপত্তি ও সমালোচনার নিশানা বানানো প্রকারান্তরে সাহাবীদেরই নিন্দা ও সমালোচনা করার শামিল। কেননা, সাহাবাদের মধ্যে এ আমল ছিল। বলাবাহুল্য, এ শ্রেণীর মানুষ সাহাবায়ে কেরামের নীতি ও পথ থেকে বিচ্যুত।
এখন হাদীসের আলোকে আমরা প্রমাণ করব যে, রুকুতে যাওয়ার সময়, উঠার সময় ও ৩য় রাকাতে দাঁড়িয়ে রাফয়ে ইয়াদাইন না করাই গ্রহণযোগ্য। আর সাহাবায়ে কেরাম ও সলফে সালিহীনের কর্মধারাও তাই ছিল। তাই শুরু ব্যতীত অন্যান্য সময় রাফয়ে ইয়াদাইন না করা চাই। যা হানাফী মাযাহাবের মুকাল্লিদগণের জন্য অবশ্যই অনুসরণীয়। আর তারা অন্য মাযহাবের অনুসরণ করবে না।
প্রথম দলীলঃ নবীজী ﷺ এর নামাযঃ অর্থাৎ- হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসঊদ (রাযি.) বলেন, আমি কি তোমাদের নিয়ে রাসূল ﷺ এর নামাযের মত নামায আদায় করব না? এর পর তিনি নামায পড়লেন এবং শুধু নামাযের শুরুতে রাফয়ে ইয়াদাইন করলেন। (জামে তিরমিযী-১/৫৯)। এ হাদীস থেকে বুঝা গেল যে, রাসূল ﷺ শুধু নামাযের শুরুতে রফয়ে ইয়াদাইন করতেন। এর পর আর করতেন না।
দ্বিতীয় দলীলঃ রাফয়ে ইয়াদাইন সম্পর্কে হাদীসের বারণঃ হযরত জাবির ইবনে সামুরা (রাযি.) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের কাছে তাশরীফ আনলেন এবং বললেন, অর্থাৎ- কি ব্যাপার আমি তোমাদের হাত উঠাতে কেন দেখি, যেন তা বেয়াড়া ঘোড়ার ঊর্ধ্বে উত্থিত লেজ সদৃশ। তোমরা নামাযে স্থির থাকবে। (সহীহ মুসলিম-১/১৮১)।
তৃতীয় দলীলঃ হযরত উমর (রাযি.)এর আমলঃ আসওয়াদ (রাহ.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, অর্থাৎ- আমি হযরত উমর (রাযি.)কে দেখেছি। তিনি শুধু প্রথম তাকবীরের সময় রাফয়ে ইয়াদাইন করতেন, পরে করতেন না। ইমাম ত্বাহাভী (রাহ.) বলেন, হযরত উমর (রাযি.)এর আমল এবং এ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরাম (রাযি.)এর কোনরূপ বিরোধিতা না থাকাই প্রমাণ করে যে, এটিই সঠিক পদ্ধতি এবং এ পদ্ধতির বিরোধিতা করা কারো জন্যে উচিত নয়।
চতুর্থ দলীলঃ হযরত আলী (রাযি.)এর আমলঃ হযরত আসিম ইবনে কুলাইব (রাহ.) তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, অর্থাৎ- হযরত আলী (রাযি.) নামাযে প্রথম তাকবীরে হাত উঠাতেন, এরপর আর হাত উঠাতেন না। এভাবে হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর (রাযি.), আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসঊদ (রাযি.)সহ খুলাফায়ে রাশেদীনের আমল এভাবেই চলে আসছে, যা স্থানাভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে না।
পঞ্চম দলীলঃ সাহাবায়ে কেরামের কর্মধারাঃ ইমাম তিরমিযী (রাহ.) বলেন, অর্থাৎ- হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসঊদ (রাযি.)এর (রাফয়ে ইয়াদাইন না করা সংক্রান্ত) হাদীস হাসান পর্যায়ে উত্তীর্ণ এবং অনেক আহলে ইলম, সাহাবা, তাবিঈন এই মত পোষণ করতেন। ইমাম সুফিয়ান সাওরী (রাহ.) ও কুফাবাসী ফকীহগণ এই ফাত্ওয়া দিয়েছেন। (জামে তিরমিযী-১/৫৯ পৃষ্ঠা)।
ষষ্ঠ দলীলঃ হযরত ইবরাহীম নাখয়ী (রাহ.) বলেন, অর্থাৎ- নামাযের শুরুতে রফয়ে ইয়াদাইন করার পর অন্য কোথাও রাফয়ে ইয়াদাইন করো না। (জামিউল মাসানীদ-১/৪৩৫, মাকতাবায়ে হানাফিয়্যা)।
এছাড়াও আরো প্রমাণাদি রয়েছে। তবে আলোচনা দীর্ঘ হওয়ার ভয়ে উল্লেখ করছি না। উপরোক্ত প্রমাণাদির আলোকে একথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, নামাযের শুরু ব্যতীত অন্যান্য স্থানে রফয়ে ইয়াদাইন করা যাবে না। এটাই হাদীসের কথা, যা ইমাম আবু হানীফারও বক্তব্য। আর আপনি যেসব হাদীস থেকে রাফয়ে ইয়াদাইনের বিষয়টি জানতে পেরেছেন, হাদীসসমূহ মূলতঃ ইসলামের প্রাথমিক যুগের। আমরা যে সব হাদীস পেশ করেছি, সেগুলো পরের এবং শক্তিশালী। যা দ্বারা হুযূর ﷺ ও সাহাবীগণের সর্বশেষ আমল নামাযের ক্ষেত্রে শুরু ব্যতীত অন্য সময় রাফয়ে ইয়াদাইন না করা প্রমাণিত হয়।
এছাড়াও ফিক্বাহ শাস্ত্রে হাদীসগুলোর বিভিন্ন জাওয়াব দেয়া হয়েছে। যেমন- নছবুর রায়া গ্রন্থে আল্লামা জামালুদ্দীন আবু মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ্ বিন ইউসুফ যাইলাঈ হানাফী (রাহ.) সালাত অধ্যায়ে এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এখানে দু’একটি জাওয়াব উল্লেখ করছি।
(ক) বুখারী ও মুসলিম শরীফে ইবনে উমর (রাযি.)এর যে হাদীসটি রফয়ে ইয়াদাইনের ব্যাপারে রয়েছে, তার বিপরীত হাদীসও তাঁর আমলের ব্যাপারে বর্ণিত রয়েছে। হাদীসটি মানছুখ হওয়ার কথাও রয়েছে।
(খ) বুখারী শরীফে বর্ণিত মুহাম্মদ ইবনে আমর ইবনে আতার হাদীসটির ব্যাপারে ইমাম ত্বাহাভী (রাহ.) শরহুল আছার কিতাবে আপত্তি উত্থাপন করেছেন।
(গ) মুসলিম শরীফে বর্ণিত ওয়ায়েল বিন হাজর এর হাদীসটিও বিরোধপূর্ণ। কেননা, তা ইবনে মাসঊদ এর হাদীসের বিপরীত। অথচ ইবনে মাসঊদ (রাযি.) ওয়ায়েল (রাযি.) থেকেও অধিক বুঝবান ও নবীর সুহবতপ্রাপ্ত। এভাবে সব হাদীসের জওয়াব রয়েছে। (নছবুর রায়া-১/৪০৭-৪১৭ পৃষ্ঠা)।
সমাধান দিয়েছেনঃ
ইসলামী আইন ও গবেষণা বিভাগ
আল-জামিয়াতুল আহ্লিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।


0 কমেন্টসগুলো:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন