দেহের পরিচ্ছন্নতায় নবী(আঃ) দের ১০ টি অভ্যাস খুজে পাওয়া যায়।
আর এই ১০টি অভ্যাস ই ইসলামে দেহের পরিচ্ছন্নতায় করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আমাদের মিল্লাতের পিতা ইব্রাহীম (আঃ) এর সুন্নাত এগুলো।তাঁর উপনাম আবুল আম্বিয়া,আবুল মিল্লাত, কেননা কয়েকজন ছাড়া সব নবী-রাসুল তাঁর বংশ থেকে এসেছেন এবং তিনি মুসলিম নামটি প্রথম রেখেছেন।
হযরত ইব্রাহীম (আঃ) থেকে প্রচলিত প্রথা
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা প্রসঙ্গে সুন্নতে
ইব্রাহীম(আঃ) হলো ১০টি।
পাঁচটি মাথায় ও পাঁচটি অবশিষ্ট শরীরে।
মাথার পাঁচটি হলো > ১. গোঁফ খাটো করা, ২. কুলি করা, ৩. নাক পরিষ্কার করা, ৪. মিসওয়াক করা, ৫. মাথার চুল দুই ভাগ করে আঁচড়ানো।
শরীরের পাঁচটি হলো > ১. নখ কাটা, ২. নাভির নিচের পশম মুণ্ডানো, ৩. খতনা করা, ৪. বগলের পশম উপড়ে ফেলা, ৫. মলদ্বার ও মূত্রদ্বার পানি দ্বারা ধৌত করা। (
তাফসিরে কুরতুবি : ১/৭৪)
হযরত আয়েশা (রাজিঃ) বলেন,
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘স্বভাবগত কাজ হলো ১০টি। গোঁফ খাটো করা, দাড়ি লম্বা করা, মিসওয়াক করা, নাকে পানি দেওয়া, নখ কাটা, হাত ও পায়ের আঙুলের গিরাগুলো ধৌত করা, বগলের পশম উপড়ে ফেলা, নাভির নিচের চুল মুণ্ডানো, ইসতেনজা করা, কুলি করা। ’ (মি
শকাত, পৃষ্ঠা ৪৪)
হযরত আবু হুরায়রা (রাজিঃ) থেকে বর্ণিত,
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘দ্বিনের স্বভাবগত কাজ হলো পাঁচটি—১. খতনা করা, ২. নাভির নিচের পশম মুণ্ডানো, ৩. গোঁফ খাটো করা, ৪. নখ কাটা, ৫. বগলের পশম উপড়ে ফেলা। ’ (
সুনানে নাসাঈ, পৃষ্ঠা ৭, মুসলিম, হাদিস নম্বর ২৫৭, আবু দাউদ, হাদিস নম্বর ৪১৯৮)
খতনা করার বিধানঃ
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, পুরুষের জন্য খতনা করা সুন্নত, আর নারীদের জন্য উত্তম। (মুসনাদে আহমাদ, ৫/৭৫) ১৩ থেকে ১৪ জন নবী-রাসুল খতনা অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেছেন। যেমন—১. হযরত আদম, ২. শিশ, ৩. ইদ্রিস, ৪. নুহ, ৫. সাম, ৬. জাকারিয়া, ৭. লুত, ৮. ইউসুফ, ৯. মুসা, ১০. শুয়াইব, ১১. সুলাইমান, ১২. ইয়াহহিয়া, ১৩. ঈসা (আঃ) ও ১৪. হযরত মুহাম্মদ ﷺ । (তাফসিরে কুরতুবি, প্রথম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৬)
খতনা করার বয়সঃ
হযরত ইবরাহিম (আঃ) নিজ পুত্র ইসমাঈল (আঃ)-এর খতনা করান ১৩ বছরের সময়, আর ইসহাক (আঃ)-এর খতনা করান সাত বছরের সময়। হযরত লাইস ইবনে সাদ (রাজিঃ) বলেন, সন্তানের খতনা করাতে হবে সাত থেকে ১০ বছরের মধ্যে।
গোঁফ ও দাড়ির বিধানঃ
হযরত ইবনে ওমর (রাজিঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘তোমরা মুশরিকদের বিপরীত করো, গোঁফ খাটো করো এবং দাড়ি লম্বা করো। ’ (মুয়াত্তা মালেক, হাদিস নম্বর ৯৪৭)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রাজিঃ) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে সুন্দর করে দাঁড়ি রেখেছেন। (তিরমিজি, হাদিস নম্বর ২৭৬২)
হযরত ইবনে ওমর (রাজিঃ) গোঁফ এরূপ খাটো করতেন যে চামড়া দেখা যেত। তিনি দাড়ি ধরতেন এবং এক মুষ্টির অধিক হলে হজ্জ ও ওমরার সময় কেটে ফেলতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর ৫৮৯২)
তাই দাড়ি কামানো, দাড়ি এক মুষ্টির কম রাখা, ফ্রেন্স কাটিং বা অন্য কাটিংয়ের দাড়ি রাখা এবং গোঁফ লম্বা রাখা কুসংস্কার। দাড়ি কামানো এবং একমুষ্টি হওয়ার আগে কেটে ফেলা ও ছাঁটা উভয়ই হারাম ও কবিরাহ গুনাহ। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, ‘তোমরা গোঁফ ছোট করো এবং দাড়ি ছেড়ে দাও। ’ (বুখারি, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৭৫)
চুলে খেযাবের বিধানঃ
চুলে কালো খেযাব দেওয়া মাকরুহ, অন্য রঙের খেযাব দেওয়া জায়েজ। হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রাঃ) মেহেদির খেযাব ব্যবহার করতেন। রাসুলুল্লাহ ﷺ খেযাব ব্যবহার করতেন না, কারণ তাঁর মাত্র ১৮ থেকে ২০টি চুল পেকেছিল। রাসুল ﷺ আবু কুয়াফার দাড়িতে খেযাব দেখে বলেছেন, চুলে সাদা ছাড়া অন্য রং করো, তবে কালো রং করা থেকে সতর্ক থাকো। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর ২১০২)
মিসওয়াক করাঃ
মিসওয়াক করা সুন্নত। রাসুলুল্লাহ ﷺ সদা এ সুন্নত পালন করতেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, যদি আমার উম্মতের ওপর কষ্টকর হবে বলে মনে না করতাম, তাহলে প্রত্যেক নামাজে (অজুুতে) মিসওয়াক আবশ্যিক করে দিতাম। (সহিহ বুখারি, মুসলিম, মিশকাত; পৃষ্ঠা নম্বর ৪৪) হযরত হুজাইফা (রাজিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ রাতে তাহাজ্জুদ নামাজের জন্য উঠলে মিসওয়াক করতেন। (মিশকাত, পৃষ্ঠা নম্বর ৪০) হযরত আয়েশা (রাজিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মিসওয়াক মুখ পরিচ্ছন্নকারী, আল্লাহ তাআলাকে সন্তুষ্টকারী (দারেমি, নাসায়ি, মিশকাত; পৃষ্ঠা নম্বর ৪৪)
মিসওয়াক করার উপকারিতা হলো, এর মাধ্যমে দাঁত পরিষ্কার হয় এবং পাকস্থলীর হজমশক্তি বৃদ্ধি পায়, রোগ প্রতিরোধ করে ও স্মরণশক্তি বৃদ্ধি পায়। সুন্নত হলো মিসওয়াক ব্যবহার করা। ব্রাশ ব্যবহার করলেও সুন্নত আদায় হবে। কারণ প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো দাঁত পরিচ্ছন্ন করা এবং মুখ দুর্গন্ধমুক্ত রাখা।
কুলি করাঃ
অজু করার সময় কুলি করা সুন্নত। ফরজ গোসলের জন্য গড়গড়া করে কুলি করা ফরজ। তবে রোজার সময় গড়গড়া করা যাবে না। কারণ এতে ভেতরে পানি প্রবেশের আশঙ্কা থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রাজিঃ) থেকে বর্ণিত, উম্মুল মুমিনিন হযরত মাইমুনা (রাজিঃ) বলেন, আমি রাসুল ﷺ-এর জন্য গোসলের পানি এনে একটি কাপড় দিয়ে পর্দা করলাম, তিনি পানি দিয়ে উভয় হাত ধৌত করেন, তারপর বাঁ হাতে পানি নিয়ে গুপ্তাঙ্গ ধৌত করে মাটিতে হাত মাসেহ করে পানি দ্বারা হাত ধৌত করেন। এরপর তিনি কুলি করেন, নাকে পানি দেন এবং চেহারা ও হস্তদ্বয় কনুই পর্যন্ত ধৌত করেন। অতঃপর গোটা শরীরে পানি ঢালেন, নাক সাফ করেন এবং উভয় পা ধৌত করেন। আমি তাঁর জন্য একটি কাপড় আনলে তিনি তা গ্রহণ না করে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে চলে গেলেন। ’ (বুখারি ও মুসলিম, মিশকাত, পৃষ্ঠা ৪৮)
নাকে পানি দেওয়াঃ
অজু করার সময় নাকে পানি দেওয়া সুন্নত। ফরজ গোসলে নাকে পানি দেওয়া ফরজ। রাসুল ﷺ বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয়, অতঃপর অজু করে, সে যেন তিনবার নাক পরিষ্কার করে। কেননা শয়তান নাকের ছিদ্রে রাত যাপন করে (বুখারি, মুসলিম, মিশকাত; পৃষ্ঠা নম্বর ৪৫)
ইসতেঞ্জার বিধানঃ
প্রস্রাব ও পায়খানা করার পর মলদ্বার ও মূত্রদ্বার পরিষ্কার করা আবশ্যক। আর এ জন্য পানি ও ঢিলা উভয়ই ব্যবহার করা হয়। পানি দ্বারা ইসতেঞ্জা করা উত্তম। আর ঢিলা ব্যবহার করা মুস্তাহাব। নাপাকি স্থান অতিক্রম করলে পানি ব্যবহার করা ওয়াজিব।
বগল ও নাভির নিচের পশমের বিধানঃ
প্রিয় নবী ﷺ বগলের পশম উপড়ে ফেলার এবং নাভির নিচের পশম মুণ্ডানোর নির্দেশ দিয়েছেন। কেননা বগলের পশম সহজে উপড়ানো যায়। পক্ষান্তরে নাভির নিচের পশম সহজে উপড়ানো যায় না। এ বিধান পরিচ্ছন্নতার জন্য। যদি কেউ এর বিপরীত করে—অর্থাৎ বগলের পশম মুণ্ডায় এবং নাভির নিচের পশম উপড়ে ফেলে, এতেও সুন্নত আদায় হয়ে যাবে।
নখ কাটার বিধানঃ
প্রিয় নবী ﷺ জুমার নামাজে যাওয়ার আগে গোঁফ ও নখ কাটতেন। (আল মাজমাহ, ২৫/১৮০) রাসুল ﷺ বলেছেন, তোমরা তোমাদের নখ কাটো, কর্তিত অংশ পুঁতে রাখো, হাত ও পায়ের গিরাগুলো ধৌত করো, মুখে লেগে থাকা খাদ্য দূর করো ও মিসওয়াক করো। দুর্গন্ধ অবস্থায় আমার কাছে এসো না। (নাওয়াদেরুল উসুল, পৃষ্ঠা নম্বর ১১৫) অন্য হাদিসে এসেছে, এক ব্যক্তি আমাদের আ'কা ﷺ-এর কাছে আকাশের খবর জানতে এলে
তিনি ﷺ বলেন, সে আকাশের খবর জানতে এসেছে অথচ তার নখ পাখির নখের মতো, তাতে ময়লা-আবর্জনা জমে থাকে। (আল কামেল : ৩/৩১৫)
সুন্নত কাজের মেয়াদঃ
হযরত আনাস (রাজিঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল ﷺ আমাদের গোঁফ খাটো করার, নখ কাটার, নাভির নিচের পশম মুণ্ডানোর এবং বগলের পশম উপড়ানোর মেয়াদ নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তা হলো ঊর্ধ্বে ৪০ দিন। (মুসলিম, হাদিস নম্বর ২৫৮, আবু দাউদ, হাদিস নম্বর ৪২০০)
মাথায় চুল রাখার বিধানঃ
আল্লাহ রাসুল ﷺ কখনো কান পর্যন্ত, আবার কখনো ছোট করে চুল রাখতেন। হযরত আনাস (রাজিঃ) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুল ﷺ -এর চুল মুবারক কানের লতি পর্যন্ত লম্বা ছিল।
হযরত আয়েশা (রাজিঃ) বলেন, আমি ও মহানবী ﷺ একই পাত্রে গোসল করতাম। তাঁর চুল মুবারক অতি দীর্ঘও ছিল না, আবার অতি খাটোও ছিল না। বরং মধ্যম পর্যায়ের ছিল। হযরত উম্মেহানি (রাজিঃ) থেকে বর্ণিত, হাদিসে এসেছে, রাসুল ﷺ-এর চুলকে চার ঝুঁটিবিশিষ্ট দেখেছি। হযরত বারা ইবনে আজেব (রাজিঃ) বর্ণনা করেন, তাঁর পাগড়ি দুই কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান পর্যন্ত প্রশস্ত ছিল। তাঁর মাথার কেশ কর্ণলতি পর্যন্ত প্রলম্বিত ছিল। হযরত আনাস (রাজিঃ)-এর অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসুল ﷺ-এর কেশ মুবারক সম্পূর্ণ বক্রও ছিল না, আবার সম্পূর্ণ সোজাও ছিল না; বরং ঈষৎ ঢেউ খেলানো ছিল। আর ওই কেশ মুবারক কর্ণলতি পর্যন্ত প্রলম্বিত ছিল। হযরত ইবনে আব্বাস ও আয়েশা (রাজিঃ) প্রমুখ থেকে বর্ণিত আছে, রাসুল ﷺ চুলে চিরুনি ব্যবহার করতেন। (শামায়েলে তিরমিজি, হাদিস : ২৩-৩০)
______________________________
তথ্য ও উপাত্ত সংগ্রহ কারিঃ
মুফতি মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম
প্রধান ফকিহ, আল জামেয়াতুল ফালাহিয়া কামিল মাদরাসা, ফেনী।
good very good
উত্তরমুছুন